Ajker Patrika

জ্বালানিসংকট নিরসনে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ০৯
জ্বালানিসংকট নিরসনে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও

দীর্ঘদিনের গ্যাস-সংকট ও আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, সাইসমিক জরিপ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করা, উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।

আজ বুধবার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বেলা সাড়ে ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি ছয়টি সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন।

সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘদিন অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশে যে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টি কূপ খনন শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রতিদিন ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।

বর্তমানে আরও সাতটি কূপ খননের কাজ চলছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২-ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩-ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে আরও দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে।’

এ ছাড়া দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে পিএসসি ও বিডিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, অফশোর ও অনশোরে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘২০২৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ওই টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি বা গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশে এলএনজি আমদানি দৈনিক আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়বে।’

এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব টার্মিনাল স্থাপন করা গেলে দেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রয়োজনীয় পণ্য—সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপযোগ্য বিভিন্ন শুল্ক ও কর শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে যাঁরা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তাঁদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কিনবে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন ব্যয় গড়ে ৬ থেকে ৭ টাকা হলে এ ব্যবস্থায় উৎপাদকদের মুনাফার সুযোগ তৈরি হবে। এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।

সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ইতিমধ্যে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি পানি, বায়ু ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।’

কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনা ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। কিছু বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দ্রুতই জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী সংসদে দেশের সামনে আগামী ১০ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে কীভাবে সাজানো হবে, সেই পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে লক্ষ্য সরকার নিয়েছে, তা অর্জনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন।’

সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ফুলবাড়িয়ার কয়লা উত্তোলনের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ফুলবাড়িয়ার কয়লা বিশ্বের উন্নত মানের কয়লার অন্যতম। এই কয়লা উত্তোলন করে দেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করা গেলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে তা দেশের জন্যও ইতিবাচক হবে।’

তবে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ও পরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ওপেন-পিট পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে সেখানে বসতবাড়ি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয় রয়েছে। তাই স্থানীয় মানুষকে কীভাবে পুনর্বাসন করা যায়, তাঁদের আয়-রোজগারের বিকল্প কীভাবে নিশ্চিত করা যায় এবং প্রকল্প থেকে তাঁরা কীভাবে উপকৃত হতে পারেন—এসব বিষয় পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বার্থের পাশাপাশি দেশের মানুষের স্বার্থকেও বিবেচনায় নিয়েই জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত