Ajker Patrika

পুলিশ কি সাধারণ মানুষকে মারধর করতে পারে

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা 
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১: ৪৩
পুলিশ কি সাধারণ মানুষকে মারধর করতে পারে
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গতকাল সোমবার পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের সময় অন্তত তিনজন সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন মারধরের শিকার হয়েছেন। এই অবস্থায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশ কি সাধারণ মানুষের ওপর হাত তুলতে পারে? যদি পারে, তাহলে তা কোন আইনে? মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, দেশের কোনো আইনই সাধারণ মানুষকে মারধরের অধিকার দেয়নি পুলিশকে। সাধারণ মানুষকে মারধর বেআইনি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় আজ মঙ্গলবার শাহবাগ থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলমের বিচার দাবি করেছেন। ওই বিক্ষোভের মধ্যেই অপেশাদার আচরণের অভিযোগে পুলিশের চার সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আজকের পত্রিকাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রমনা বিভাগের ডিসি মো. মাসুদ আলম।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী আবু নোমান শাওন আজকের পত্রিকাকে বলেন, অভিযান ও তল্লাশির নামে পুলিশি হয়রানি, নির্যাতন ও মারধর করা কোনো আইন বৈধতা দেয় না। পুলিশকে বলা হয় জনগণের বন্ধু। কিন্তু সম্প্রতি বিতর্কিত কিছু ঘটনায় পুলিশের সেই ভাবমূর্তি ম্লান হয়েছে। জনগণের জানমাল ও সম্পদের হেফাজত না করে পুলিশের কিছু অংশ সাধারণ মানুষকে নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। সেই পুলিশ কারও গায়ে হাত তুলতে পারে না।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী লতিফুর রেজা বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনাটি নিঃসন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আবারও প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। যেকোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার আইনসংগত নয়। যদি কেউ আইন ভঙ্গ করে বা কোনো অপরাধের প্রমাণ না থাকে, বা বৈধ গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া ছাড়া শিক্ষার্থী, সাংবাদিক বা সাধারণ নাগরিককে শারীরিকভাবে আঘাত বা অতিরিক্ত বল প্রয়োগ সংবিধানের ৩১,৩২ ও ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৬ অনুযায়ী গ্রেপ্তারের সময় কেবল প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক বলপ্রয়োগ বৈধ। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩২৩ ও ৩৫০ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের আঘাত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি আদেশ দেন। ওই আদেশে বলা হয়, পুলিশের দায়িত্ব অনেক বেশি। পুলিশ জনগণকে সুরক্ষা দেবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তারা বেশি দায়ী হবে। পুলিশের জন্য আলাদাভাবে আইন কোনো দায়মুক্তি দেয় না। তারাও অন্য ১০ জন ব্যক্তির মতোই ফৌজদারি আইনের আওতাভুক্ত। কারও গায়ে হাত তোলার ক্ষমতা কোনো আইনই পুলিশকে দেয়নি। এমনকি সে ব্যক্তি যদি কোনো অপরাধের আসামিও হন। সংবিধানের ৩১,৩২ ও ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে বিনা কারণে আটক করার ক্ষমতা পুলিশের নেই।

অধ্যাপক কাজী লতিফুর রেজা আরও বলেন, হাইকোর্ট বিভাগ সাইফুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ৫৬ ডিএলআর (২০০৪) মামলায় বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘যৌক্তিক ও আনুপাতিক’ নীতির স্বীকৃতি দিয়েছেন। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা এফআইআর বা সিআর মামলা দায়ের করতে পারেন। তিনি পরামর্শ দেন, ডিএমপি কমিশনার বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। পুলিশ বা কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে কাউকে শাস্তি দিতে পারে না; অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ ও আঘাত মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত