Ajker Patrika

সংসদ অধিবেশন: উত্তাপ ও অচলাবস্থায় ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা

তানিম আহমেদ, ঢাকা 
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৪
সংসদ অধিবেশন: উত্তাপ ও অচলাবস্থায়
ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা
ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে ৯ কার্যদিবসে। সময়ের হিসাবে সংক্ষিপ্ত হলেও এই অধিবেশন ছিল উত্তেজনায় ভরা। প্রায় প্রতিটি কার্যদিবসে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে দফায় দফায় হয়েছে তীব্র বিতর্ক। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে একাধিকবার সংসদে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি একমাত্র স্বতন্ত্র নারী সংসদ সদস্যকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অশালীন কটূক্তির ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে স্পিকারের আসন থেকে সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করা হয়েছে।

সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, এই অধিবেশনে দুই পক্ষের মধ্যে একটা মেরুকরণ দেখতে পেয়েছি, যা সংসদীয় রাজনীতির জন্য খুব বেশি সংগতিপূর্ণ নয়। তৃতীয় অধিবেশন থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ অধিবেশনগুলোতেও এ বিরোধিতা থাকবে। এতে দেশের প্রধান ইস্যুগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা ও তর্ক সুষ্ঠুভাবে হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।’

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার এই অধিবেশন শুরু হয় ২৭ আগস্ট। চার দিনের সাপ্তাহিক ছুটি ও দুই দিনের বিরতি মিলিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হয় অধিবেশন। এতে ছয়টি বিল পাস হয়। এর বাইরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট, সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বিদেশে পলাতক পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংসদে সাধারণ আলোচনা হয়।

প্রথম দিনই উত্তেজনা

অধিবেশন শুরুর দিনই উত্তপ্ত হয়, প্রশ্নোত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য ঘিরে। বিরোধী দলের দুই সদস্যের প্রশ্নকে তিনি শাহবাগ স্কয়ার ও পল্টনের বক্তৃতার সঙ্গে তুলনা করেন। বিরোধী দলের সদস্যরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের কাছে আশ্রয় চান এবং পরে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেন। তাতেও পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ায় প্রায় ১০ মিনিট সংসদের কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিরোধী দলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার অভিযোগ তুলে ঘটনাটিকে ‘সংসদীয় ফ্যাসিবাদ’ বলে আখ্যা দেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যেভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ করেছি, তা সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়। আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত।’

দ্বিতীয় কার্যদিবসে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। তাদের অভিযোগ, সরকার সংস্কারের নামে আংশিক পরিবর্তন করে সংসদকে একতরফাভাবে পরিচালনা করছে। পরে বিল দুটি পাসের দিনও এবং সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির বৈঠক থেকেও ওয়াকআউট করে তারা। বিল দুটি পাসের প্রতিবাদে মুখে কালো কাপড় বেঁধে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়ে বিতর্ক

নিয়মের বাধ্যবাধকতার কারণে তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই গঠন করা হয়েছে ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে অন্তত চার দফায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়।

৩০ আগস্ট দ্বিতীয় কার্যদিবসে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জুলাই জাতীয় সনদের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন, সংসদে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২৬ শতাংশ সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দিতে হবে।

জবাবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদ্যমান বিধান ও রেওয়াজ অনুযায়ী বিরোধী দলকে কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটিতে যোগ দিলে তাদের প্রত্যাশিত হারে কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বিরোধী দল এতে আপত্তি জানিয়ে বলে, একটি বিষয়ের সঙ্গে আরেকটির শর্ত জুড়ে দেওয়া যায় না। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে তারা নীতিগতভাবে যুক্ত হবে না; তবে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে আনুপাতিক হারে তাদের অধিকার রয়েছে।

পরবর্তী আরও তিন কার্যদিবসে বিষয়টি নিয়ে দুই দলের মধ্যে বাহাস হয়। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলকে কোনো মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির পদ না দিয়েই ৩৯টি কমিটি গঠন করে সরকারি দল। সংসদ-সম্পর্কিত ১১টি বিষয়ভিত্তিক কমিটিও গঠন করা হয়। এর মধ্যে বিরোধী দলের হাতে রয়েছে মাত্র একটি কমিটির সভাপতির পদ, যা আগের অধিবেশনেই গঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে বিরোধী দল সভাপতির পদ পেয়েছে মাত্র একটিতে।

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে তীব্র আপত্তি

পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল নিয়েও বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি ছিল। বিলটিকে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আখ্যা দিয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করেন এবং পাসের প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে কিছু সময়ের জন্য সংসদকক্ষ ত্যাগ করেন। পরে ফিরে এসে সংশোধনী আলোচনায় অংশ নেন। সমাপনী বক্তব্যেও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিলটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, আইনটি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রপতিকে বিলে স্বাক্ষর না করারও অনুরোধ করেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিলটি পাস করার আগে একটি কমিটির মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে যাচাই করার সুযোগ ছিল। সরকার ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে এগোলেও মনে হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অধিবেশনের শেষ দিনে র‍্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের বিল পাস হয় জাতীয় সংসদে। নতুন বিশেষায়িত বাহিনীর বিষয়ে বিরোধী দলের অভিযোগ, র‍্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি ও দায়দায়িত্ব সরাসরি এসআরবির কাছে চলে যাবে। অর্থাৎ শুধু সাইনবোর্ড বদলাচ্ছে—নতুন বোতলে পুরোনো মদ। র‍্যাবের নাম ছাড়া আর কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে না। এতে গুমসহ অনেক অপরাধের মামলা ও তদন্ত ত্রুটির মুখে পড়বে।

জবাবে সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল র‍্যাব বিলুপ্ত করা, সেটা করা হচ্ছে। এখন এই বিল যতই বিলম্বিত হবে র‍্যাবের অস্তিত্ব ঠিকই রয়ে যাবে, র‍্যাবই রয়ে যাবে।

রুমিনের বক্তব্য ঘিরে হট্টগোল

ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি না থাকলেও বিলটি নিয়ে আলোচনার সময় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়।

রুমিন ফারহানা ২০০১ সালের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে গ্যাস, বিদ্যুৎ, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করলে সরকারি দলের সদস্যরা হইচই করে প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে তাঁকে লক্ষ্য করে কটূক্তি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরাও প্রতিবাদ করেন।

অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত জ্বালানি ও গ্যাস-সংকট, বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমের উত্থাপিত পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমদকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং নাজিবুর রহমানের উত্থাপিত সার-সংকট নিয়ে সংসদে সাধারণ আলোচনা হয়।

জ্বালানি ও গ্যাস-সংকট নিয়ে আলোচনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানা বন্ধ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি উঠে আসে। বেনজীর আহমদের প্রত্যর্পণ বিষয়েও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলের সদস্যরা। আর সার-সংকটের কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়ে সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়।

এসব নোটিশের ওপর আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেন। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী ভোটে দেওয়া হলে একটি প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়। তবে ভোটের সময় স্পিকার মূল প্রস্তাবটি কিছুটা সংশোধন করে উত্থাপন করেন।

তবে সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার-বিরোধী দল মোটামুটি ধারণা অনুযায়ীই চলছে। কিছু উত্তেজনা থাকবেই, এগুলো গণতান্ত্রিক প্র্যাকটিসের মধ্যে পড়ে। ওয়াকআউটও সংসদীয় চর্চার অংশ। এটা খারাপ নয়।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত