Ajker Patrika

এক দিনের জকিগঞ্জ ভ্রমণ

ইমরান ইমন
আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০: ৫০
এক দিনের জকিগঞ্জ ভ্রমণ
জকিগঞ্জ কাস্টম ঘাট। ছবি: লেখক

সপ্তাহজুড়ে অফিসে কাজ করতে করতে সময় কীভাবে চলে যায়, বোঝা দুষ্কর। ব্যস্ততার ফাঁকে কোথাও একটু ঘোরার ইচ্ছা হয়। তাই বেরিয়ে পড়লাম সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জের উদ্দেশে। পরিকল্পনা ছিল, এক দিনে যতটা সম্ভব ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা জনপদটি ঘুরে দেখব। বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখার আগ্রহে মন রোমাঞ্চিত।

শুক্রবার সকালে নাশতা খেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম সিলেট শহরের কদমতলী বাসস্ট্যান্ডের দিকে। সেখান থেকে মাত্র ১৫০ টাকা দিয়ে শুরু হলো জকিগঞ্জ ট্যুর। শহরের কোলাহল থেকে বাস যতই এগোচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে চারপাশের দৃশ্যপট।

প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো সাজিদ রাজার বাড়ি

সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কাজলসার ইউনিয়নের সুরমা নদীর তীরে আটগ্রাম বাজারের কাছে ঐতিহাসিক সাজিদ রাজার বাড়ি। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো বাড়িটি এখনো অনেকটাই অক্ষত। পুরোনো স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, সময় যেন এখানে খানিকটা থমকে গেছে। বাড়িটি দেখভালের জন্য রাজার পরিবারের কেউ না থাকলেও রয়েছেন কেয়ারটেকার। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, একসময় দেওয়ান হাসন রাজাসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির পদচারণ এবং আড্ডায় মুখর ছিল এই বাড়ি।

বাড়ির পাশেই রয়েছে সাজিদ রাজার মসজিদ। জানা যায়, ধর্মপ্রাণ সাজিদ রাজা ১৭৪০ সালে বাড়ির সামনে মসজিদটি নির্মাণ করেন। কালক্রমে এটি ‘সাজিদ রাজার মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। স্থানীয়ভাবে মসজিদটি ‘আটগ্রাম বড় মসজিদ’ নামেও পরিচিত। পানির সংকট থেকে বাঁচতে মসজিদের পাশেই রাজা খনন করেন এক বিশাল দিঘি।

সাজিদ রাজার মসজিদ
সাজিদ রাজার মসজিদ

মরমি সাধক শিতালং শাহর সমাধি

জকিগঞ্জের বারঠাকুরী ইউনিয়নে রাস্তার পাশেই চোখে পড়বে ‘শীতলাঙ্গীয়া শাহী ঈদগাহ ও মাদ্রাসা’ লেখা সাইনবোর্ড। সেই পথ ধরে এগিয়ে গেলে পাওয়া যাবে আঠারো শতকের প্রখ্যাত সুফি সাধক ও মরমি কবি শিতালং শাহর সমাধি। ফলকে লেখা আছে তাঁর প্রকৃত নাম মোহাম্মদ ছলীম উল্লাহ। সিলেট অঞ্চলে (করিমগঞ্জ, ভারত) তাঁর জন্ম। আধ্যাত্মিক সাধনা ও মরমি সংগীতের মধ্য দিয়ে তিনি আজও মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

তিন নদীর মোহনায় প্রকৃতির গান

শিতালং শাহর সমাধিস্থল থেকে পাঁচ-সাত মিনিট হাঁটলে পৌঁছানো যায় তিন নদীর মোহনায়। স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি তি-গাঙ্গা নামে সুপরিচিত। বারঠাকুরী ইউনিয়নের আমলশীদ গ্রামে অবস্থিত এই স্থান নদীপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অনন্য।

ভারত থেকে প্রবাহিত বরাক নদ এসে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়েছে এখানে। এতে তৈরি হয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। নদীর বিস্তৃত জলরাশি, শীতল বাতাস আর নীল আকাশ। সব মিলিয়ে জায়গাটি মনোমুগ্ধকর।

মোহনার পাশে সুরমা নদীর তীর ঘেঁষে রয়েছে ঐতিহাসিক বারঠাকুরী গায়েবি দিঘি। তবে কালের বিবর্তনে দিঘিটির আর দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। সেখানে এখন বিস্তৃত কৃষিজমি।

কুশিয়ারার তীরে জকিগঞ্জ কাস্টম ঘাট

কুশিয়ারা নদীর তীরঘেঁষা এই জায়গা বেশ মনোরম। এখান থেকে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি ওপারে ভারতের করিমগঞ্জও দেখা যায়। নদীপথে নৌকায় মানুষজনের পারাপারের দৃশ্য চোখে পড়ে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় জায়গাটির রয়েছে আলাদা ভৌগোলিক গুরুত্ব।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে ঘাটে গিয়ে দেখলাম, শিশুরা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। দৃশ্যটি বেশ উপভোগ্য। ঘুড়ির নাটাই বাংলাদেশের মাটিতে আর ঘুড়ি উড়ছে ভারতের আকাশে! সীমান্তের দুই পাশের আকাশ ঘুড়ির সুতোয় বাঁধা। এমন দৃশ্য সহজে মন কেড়ে নেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় দুরন্ত শৈশবকেও।

স্থানীয় মানুষজনের কাছেও জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেকে এখানে অবসর সময় কাটাতে আসেন—নদীর শান্ত পরিবেশ, খোলা আকাশ আর ওপারের ভূখণ্ডের দৃশ্য দেখতে। সব মিলিয়ে জকিগঞ্জ কাস্টম ঘাট হতে পারে বিকেলের সময় কাটানোর চমৎকার গন্তব্য।

ফুলতলী সাহেবের স্মৃতিবিজড়িত আঙিনা

ঘড়ির কাঁটা তখন সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে। সূর্যও অস্তাচলে। জকিগঞ্জ বাজার থেকে দশ সিটা নামে পরিচিত একধরনের সিএনজিচালিত গাড়িতে চড়ে রওনা হলাম রতনগঞ্জ বাজারের উদ্দেশে। সেখান থেকে যেতে হবে ফুলতলী গ্রামে।

আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.) (১৯১৩–২০০৮) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, আলেম, হাদিস বিশারদ ও সুফি সাধক। তিনি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ফুলতলী গ্রামে জন্মেছিলেন। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি জকিগঞ্জের ফুলতলী গ্রামের কথা। সেই সঙ্গে ফুলতলী সাহেবের নামও; কিন্তু কখনো যাওয়া হয়নি। এবারই প্রথম তাঁর স্মৃতিবিজড়িত আঙিনায় পা রাখলাম।

সেখানে পৌঁছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে নামাজ আদায় করলাম। এরপর তাঁর কবর জিয়ারত করে আশপাশটা ঘুরে দেখলাম। বিশাল পুকুর, মসজিদ ও মাদ্রাসা ঘিরে এক সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। চারপাশ যেন সাজানো-গোছানো বাগান। মাদ্রাসায় রয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে অনেক এতিম শিক্ষার্থীও এখানে পড়াশোনা করছে।

ফুলতলী সাহেব (রহ.) দেশ-বিদেশে কোরআনের শুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষা এবং ইসলামি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এখনো চলমান। তাঁর রয়েছে একাধিক বই। ২০০৮ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জকিগঞ্জের ফুলতলী গ্রামে নিজের প্রতিষ্ঠিত মসজিদের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

ফুলতলী মাদ্রাসা
ফুলতলী মাদ্রাসা

একাকী ভ্রমণ

এক দিনের এই জকিগঞ্জ ভ্রমণ সিলেট থেকে যাত্রা করে শুরু হয়েছিল আটগ্রাম দিয়ে। আর শেষ হলো ফুলতলী গ্রামে পৌঁছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে দেখলাম ইতিহাস, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা আর প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিলেটের বেশ বড় একটি উপজেলা। সাজিদ রাজার বাড়ি ও মসজিদের প্রাচীন স্থাপত্য, শিতালং শাহর মরমি দর্শন, তিন নদীর মোহনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কাস্টম ঘাটের সীমান্তঘেঁষা জীবন এবং ফুলতলী সাহেবের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান। সবকিছুই ভ্রমণকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

যেভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সিলেট শহরে এসে সেখান থেকে জকিগঞ্জ। তবে সিলেট শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে এর দূরত্বে ভিন্নতা আছে। সিলেট শহর থেকে শেওলা হয়ে জকিগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। রতনগঞ্জ হয়ে দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার এবং কালীগঞ্জ হয়ে দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত