Ajker Patrika

ছাইয়ের নিচে ঢাকা প্রাচীন রোমান নগরীর অন্দরমহল

ফিচার ডেস্ক
ছাইয়ের নিচে ঢাকা প্রাচীন রোমান নগরীর অন্দরমহল
ভেসুভিয়াসের ছাই শুধু একটি শহরকেই কেড়ে নেয়নি। এটি দুই হাজার বছর ধরে আগলে রেখেছিল মানুষের হাসি-কান্না, সাজসজ্জা আর বেঁচে থাকার ছোট ছোট স্মৃতির গল্পগুলো। ছবি: সংগৃহীত

গল্পের শুরুটা হয়েছিল প্রায় দুই হাজার বছর আগে, খ্রিষ্টীয় ৭৯ সালের এক ভয়াল দিনে। ইতালির মাউন্ট ভেসুভিয়াসের আকস্মিক অগ্ন্যুৎপাতে চোখের পলকে তেরাওনের নিচে চাপা পড়েছিল প্রাচীন রোমান একটি নগরী। খ্রিস্টীয় ৭৯ সালের ২৪ আগস্ট। ইতালির মাউন্ট ভেসুভিয়াসের ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত চোখের পলকে চিরকালের মতো মানচিত্র থেকে মুছে দিয়েছিল সমৃদ্ধ রোমান নগরী পম্পেইকে। পুরু ছাই ও লাভা স্তূপের নিচে চাপা পড়ে এই শহরটি প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। ১৭৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এর খননকার্য আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং বৃহত্তম প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান হিসেবে বিবেচিত। সময়ের স্রোতে ইতিহাস চাপা পড়লেও আজও তার বুক থেকে বেরিয়ে আসে রোমাঞ্চকর সব রহস্য। সম্প্রতি পম্পেইয়ের দীর্ঘ খননকাজে এমন এক আবিষ্কার হয়েছে, যা আমাদের সরাসরি নিয়ে যায় প্রাচীন রোমানদের অন্দরমহলে।

সিল করা এক আলমারি

পম্পেইয়ের অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা ভিয়া দেল আব্বোন্দানজা। এটি প্রাচীন পম্পেই শহরের অন্যতম প্রধান রাস্তা যার নামের আক্ষরিক অর্থ প্রাচুর্যের রাস্তা। সেখানে একটি বাড়িতে খননকাজ চালাতে গিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের দল মুখোমুখি হয় এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের। গবেষকরা খুঁজে পান কাঠের তৈরি একটি আলমারি, যা অগ্ন্যুৎপাতের পর থেকে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে একদম সিল করা অবস্থায় ছিল! আলমারিটি খুলতেই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে সেকালের এক বাসিন্দার দৈনন্দিন জীবন। ভেতরে সাজানো ছিল প্রসাধন সামগ্রী, সুগন্ধির কাচের শিশি, ব্রোঞ্জের লণ্ঠন, রান্নার পাত্র এবং ৩৮টি ব্রোঞ্জ মুদ্রা ভরা একটি ছোট থলে। গবেষকদের মতে, এত সব মূল্যবান জিনিস ফেলে রেখে যাওয়ার অর্থ হলো, ভেসুভিয়াসের লাভা ধেয়ে আসার পর ঘরের মালিক সেগুলো গুছিয়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র সময় পাননি।

শিশুদের ‘জাদুকরী’ নেকলেস

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রত্নটি ছিল একটি শিশুদের ‘জাদুকরী’ নেকলেস বা ‘ক্রিপুন্ডিয়া’। ২৪ টিরও বেশি ক্ষুদ্র বস্তু দিয়ে তৈরি এই নেকলেসে ঝুলে ছিল ব্রোঞ্জ ও কাঁচের তৈরি ছোট ছোট তাবিজ, দেব-দেবী বেস ও বুধের প্রতীক। এমনকি ছোট হাত ও আঙুরের গোছা। প্রাচীন রোমান যুগে শিশুদের সুরক্ষাকবচ হিসেবে এগুলো গলায় পরানো হতো। যাতে ভিড়ের মধ্যে তাদের সহজেই চেনা যায় এবং অশুভ শক্তি দূরে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও অনেকে নস্টালজিয়া থেকে এই স্মৃতিচিহ্নগুলো সযত্নে রেখে দিতেন।

খননে অভিজাতদের বিলাসবহুল অংশের চেয়ে সাধারণ দাস-দাসীদের থাকার জায়গা বা রান্নাঘরের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
খননে অভিজাতদের বিলাসবহুল অংশের চেয়ে সাধারণ দাস-দাসীদের থাকার জায়গা বা রান্নাঘরের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

দাসের কোয়ার্টার ও প্রাচীন অর্থনীতি

‘ভিলা অব দ্য মিস্ট্রিজ’-এর আশেপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক খননে অভিজাতদের বিলাসবহুল অংশের চেয়ে সাধারণ দাস-দাসীদের থাকার জায়গা বা রান্নাঘরের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পম্পেইয়ের সাম্প্রতিক খননকার্যগুলো যেন এক একটি জীবন্ত টাইম ক্যাপসুল। কোথাও উদ্ধার হয়েছে দাসদের বন্দিশালা ও প্রাচীন বেকারি, যেখানে পশুর মতো আটকে রেখে রুটি তৈরি করানো হতো; আবার কোথাও পাওয়া গেছে গ্রিক মিথলজির রঙিন দেওয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কো। এছাড়া সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের লৌজানে এই পম্পেইয়ের ইতিহাসকে ৩৬০ ডিগ্রি ভিআর প্রজেকশনের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। সেখানে দর্শনার্থীরা গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই কিংবা ভিলার অলিগলি ঘুরে দেখার রোমাঞ্চ উপভোগ করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পম্পেইয়ের বিভিন্ন ঘরে চমৎকার সব রঙিন দেওয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কো উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গ্রিক মিথলজির বিভিন্ন চরিত্র ও সুস্বাদু খাবারের (যেমন পিৎজার পূর্বসূরি বা প্রাচীন ফ্যাটব্রেড) চিত্রযুক্ত ট্রে ও পাত্রের সন্ধান মিলেছে, যা তাদের উন্নত জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিচয় দেয়।

অনুসন্ধানের ইতিহাস

১৮০০ সালের শেষের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক জুসেপ্পে ফিওরেল্লী এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ করেন যে, ছাইয়ের স্তূপের নিচে চাপা পড়া মৃতদেহগুলো শত শত বছর ধরে পচে গিয়ে কঙ্কালসার হয়ে গেলেও ছাইয়ের মধ্যে ফাঁপা অবয়ব বা গহ্বর তৈরি হয়ে আছে। তিনি সেই ফাঁপা জায়গায় তরল প্লাস্টার ঢেলে মৃত মানুষদের শেষ মুহূর্তের হুবহু ভঙ্গি ও মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলেন। এই প্লাস্টার কাস্টগুলো আজও পম্পেইর প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের স্তব্ধ করে দেয়। গত কয়েক দশক ধরে প্রথাগত খননের পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পম্পেইর লুকানো ইতিহাস উন্মোচন করা হচ্ছে। যেমন ড্রোন স্ক্যানিং, থ্রিডি লেজার ম্যাপিং, গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

ভেসুভিয়াসের ছাই শুধু একটি শহরকেই কেড়ে নেয়নি। এটি দুই হাজার বছর ধরে আগলে রেখেছিল মানুষের হাসি-কান্না, সাজসজ্জা আর বেঁচে থাকার ছোট ছোট স্মৃতির গল্পগুলো।

সূত্র: রয়টার্স, ইএন ভলস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত