Ajker Patrika

জ্বর নিয়ে প্রচলিত ৮টি ভুল ধারণা, যা জেনে রাখা জরুরি

সিলভিয়া সামান্থা সেঁজুতি
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ৩৯
জ্বর নিয়ে প্রচলিত ৮টি ভুল ধারণা, যা জেনে রাখা জরুরি
ছবি: পেক্সেলস

ঋতু বদলের এই সময়ে অনেকে জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা অন্য কোনো সংক্রমণের কারণে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে জ্বর হতে পারে। অনেক সময় জ্বর শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় থাকার একটি লক্ষণ। জ্বর নিয়ে প্রচলিত নানা ভুল ধারণার কারণে অনেকে আতঙ্কিত হয়, আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করে। জ্বর হলেই ভয় পাওয়া বা তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খাওয়া দুটিই সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। তাই জ্বরের সময় কী করা উচিত, আর কোন ধারণাগুলো থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন, তা সবার জানা জরুরি।

জ্বর মানেই বিপজ্জনক

জ্বর শুরু হলে যে বড় কোনো বিপদ শুরু হয়ে গেছে শরীরে, এমন নয়। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জ্বর দেখা দিতে পারে। ভাইরাসজনিত সংক্রমণে হওয়া হালকা জ্বর অনেক সময় নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে মনে রাখতে হবে, শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে তা উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকে শারীরিক জটিলতা রয়েছে, এমন মানুষের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

জ্বর হলেই ওষুধ খেতে হবে

শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বাড়লে জ্বর কমানোর ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই। জ্বরের সঙ্গে অস্বস্তি, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে। জ্বর কমানোর ওষুধ মূলত অস্বস্তি কমায়; জ্বরের আসল কারণ সব সময় দূর করে না।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার জানিয়েছেন, ‘আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্বর হলেই ফার্মেসি থেকে, নিজের ইচ্ছেমতো বা কোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ কিনে খাওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা রয়েছে। অধিকাংশ জ্বরই ভাইরাসজনিত, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। কারণ, অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে।’

ডা. কাকলী হালদার আরও বলেন, ‘অপ্রয়োজনে বা ভুল মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে শরীরে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর তৈরি হয়। এর অর্থ হলো, পরবর্তী সময়ে সত্যি সত্যি যখন মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হবে, তখন ওই ওষুধ আর শরীরে কাজ করবে না। এ ছাড়া যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, ডায়রিয়া, লিভার ও কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপের পাশাপাশি শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াও ধ্বংস হয়ে যায়।’

তাই জ্বর হলে নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স ও ওজন অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি। জ্বরের কারণ বুঝতে এবং উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

জ্বর হলে খাওয়াদাওয়া বন্ধ রাখতে হয়

জ্বর হলে অনেকেরই খাবারে অরুচি দেখা দেয়। এ সময় কেউ কেউ মনে করে, না খেয়ে থাকলে দ্রুত জ্বর সেরে যাবে। কিন্তু অসুস্থতার সময় শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও পানির জোগান ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরে শরীর থেকে ঘাম ও অন্যান্য উপায়ে তরল বেরিয়ে যায়। তাই বেশি করে পানি পান করা জরুরি। এর পাশাপাশি স্যুপ, পাতলা খিচুড়ি, নরম ভাত, ফলমূল এমন খাবার বেছে নিন। বেশি খেতে অসুবিধা হলে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাওয়া ভালো। জোর করে বেশি খাবার খাওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পানিশূন্যতা এড়িয়ে চলতে হবে।

ছবি: পেক্সেলস
ছবি: পেক্সেলস

জ্বর একবার শুরু হলে বাড়তেই থাকবে

জ্বরের তাপমাত্রা সব সময় ক্রমাগত বাড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলে জ্বর কমে আসে। আবার দিনের বিভিন্ন সময়ে শরীরের তাপমাত্রায় কিছুটা ওঠানামাও হতে পারে। তবে জ্বর কমছে না, বারবার ফিরে আসছে কিংবা এর সঙ্গে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখুন। জ্বর কয়েক দিন স্থায়ী হলে বা শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

জ্বর মানেই গুরুতর কোনো অসুখ

জ্বর অনেক ধরনের অসুস্থতার উপসর্গ হতে পারে। সাধারণ সর্দি-কাশি কিংবা ভাইরাসজনিত সংক্রমণেও জ্বর দেখা দেয়। তাই জ্বর হলে গুরুতর রোগ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। আবার একে সব সময় সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অবহেলা করাও উচিত নয়। জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি কিংবা র‍্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

ঘাম হলেই বুঝতে হবে জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে

জ্বরের সময় বা জ্বর কমার পর্যায়ে ঘাম হতে পারে। তবে ঘাম হওয়াই যে জ্বর সেরে যাওয়ার নিশ্চিত লক্ষণ, তা নয়। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও ঘাম হয়। জ্বরের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘাম হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। তাই ঘাম হচ্ছে বলে নিশ্চিন্ত না হয়ে শরীরের তাপমাত্রা খেয়াল রাখা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। ভেজা পোশাক পরিবর্তন করে আরামদায়ক পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়া উপকারী।

ছবি: পেক্সেলস
ছবি: পেক্সেলস

শরীর গরম না লাগলে জ্বর নেই

গায়ে হাত দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা বোঝার চেষ্টা অনেকেই করে। শরীর স্পর্শ করে জ্বর নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা যায় না। জ্বর থাকলেও কারও কারও শীত ভাব হতে পারে, এমনকি কাঁপুনিও দেখা দিতে পারে। সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের নির্ধারিত মাত্রা বাড়িয়ে দিলে এমন অনুভূতি হতে পারে। তাই শরীর গরম লাগছে কি না, শুধু সেটির ওপর নির্ভর না করে থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা ভালো।

সবার জ্বরের মাত্রা ও ঝুঁকি এক

একই তাপমাত্রার জ্বর সবার জন্য সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে যে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম উদ্বেগের কারণ, নবজাতকের ক্ষেত্রে তা গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে তিন মাসের কম বয়সী শিশুর তাপমাত্রা ১০০ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। বয়স্ক ব্যক্তি এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম—এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও জ্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ডা. কাকলী হালদার জানান, জ্বর হলে আতঙ্কিত না হয়ে থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা, পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়া ও বিশ্রাম নেওয়াই প্রথম কাজ। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল উপসর্গ উপশমের ওষুধ (যেমন প্যারাসিটামল) খাওয়া যেতে পারে। আর অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রয়োজন আছে কি না, তা রক্তের পরীক্ষা নিরীক্ষা ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।

সূত্র: কন্টিনেন্টাল হসপিটাল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত