Ajker Patrika

সর্বোচ্চ নম্বরে স্বপ্নীলের স্বর্ণজয়

আবদুর রাজ্জাক খান
আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৫৭
সর্বোচ্চ নম্বরে স্বপ্নীলের স্বর্ণজয়

টানা চার বছর প্রতিটি সেমিস্টারে সিজিপিএ-৪-এ ৪। শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে আসলে ততটাই কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন কাজই করে দেখিয়েছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা মোছা. স্বপ্নীল আক্তার নূ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অর্জন করেছেন আচার্য স্বর্ণপদক। একই সঙ্গে তিনি হয়েছেন ভ্যালেডিক্টোরিয়ান। শুধু তা-ই নয়, এর আগে টানা দুবার ডিনস লিস্ট অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন স্বপ্নীল।

স্বপ্নীলের এই অর্জন মোটেও সহজ ছিল না। এ জন্য তাঁকে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষায় তাঁকে অর্জন করতে হয়েছে সর্বোচ্চ নম্বর। স্বপ্নীল বলেন, ‘চার বছরের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে, এটিই সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।’ প্রতিটি সেমিস্টারে সিজিপিএ ৪-এ ৪ ধরে রাখা কতটা মানসিক চাপের, তা শুধু স্বপ্নীলই জানেন। সেই চাপকে তিনি নেতিবাচকভাবে না নিয়ে বরং প্রেরণা হিসেবে নিয়েছেন। নিজেকে সব সময় বলেছেন ‘আমি পারব’।

সাফল্যের খবর স্বপ্নীল প্রথম জানিয়েছেন তাঁর মা-বাবাকে। তিনি বলেন, ‘বাবা আমার সুপার হিরো।’ সব সময় মেয়ের স্বপ্নে বিশ্বাস রেখেছেন তিনি। মা-ও সব সময় ছায়ার মতো পাশে থেকেছেন। শিক্ষকদের কাছ থেকেও পেয়েছেন অফুরান ভালোবাসা ও উৎসাহ। বিশেষ করে বিভাগের অ্যাডভাইজারের দিকনির্দেশনা তাঁকে লক্ষ্যপানে স্থির থাকতে সাহায্য করেছে। স্বপ্নীলের মতে, একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় শক্তি নিজের ওপর বিশ্বাস এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের মানসিকতা।

স্বপ্নীল সারা দিন বই নিয়ে বসে থাকতেন না। দিনের বেলায় অন্যান্য কার্যক্রমে যুক্ত থাকলেও সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট সময় ছিল পড়ার জন্য। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। কঠিন কোর্সগুলোতে বাড়তি সময় দিতেন। প্রয়োজনে রাত জেগেছেন, কিন্তু লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার—প্রতিটি বিষয়ে সেরাটা দেওয়া।

কিছু কোর্স এতটাই কঠিন মনে হয়েছে, কখনো ধারণা করেছেন, আর সম্ভব নয়। কিন্তু পরিবার, প্রিয়জন এবং সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা তাঁকে নতুন করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। স্বপ্নীল বলেন, ‘আমি নিয়মিত নামাজে আল্লাহর কাছে নিজের কথা বলতাম। বিশ্বাস করি, আল্লাহ যা করেন, আমাদের ভালোর জন্যই করেন।’ এই বিশ্বাসই তাঁর মানসিক শক্তির উৎস।স্বপ্নীলের এই যাত্রায় বড় সহায়তা ছিল ৬৫ শতাংশ টিউশন ফি ওয়েভার। এতে তাঁর পরিবারের আর্থিক চাপ কমেছে এবং তিনি পড়াশোনায় আরও মনোযোগ দিতে পেরেছেন। তবু প্রত্যাশার ভার ছিল। প্রতিবারই সেই চাপকে জয় করে এগিয়ে গেছেন।

শুধু পড়াশোনা নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও ছিলেন সক্রিয়। বিএনসিসিতে যুক্ত থেকে শিখেছেন শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েট হিসেবে পার্টটাইম কাজ করেছেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর সময় ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্ববোধকে শাণিত করেছে। নিয়মিত সেমিনার ও আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন নিজেকে। তাঁর মতে, ভালো ফলের পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা, উপস্থাপনা, সমস্যা সমাধান ও দলগত কাজের সক্ষমতা গড়ে তোলা সমান জরুরি।

জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল থানার দাশড়া সরাইল গ্রামে জন্ম স্বপ্নীলের। বেড়ে ওঠা জয়পুরহাট শহরে। এসএসসি জয়পুরহাট সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং এইচএসসি জয়পুরহাট সরকারি কলেজ থেকে। দুটিতে অর্জন করেছেন জিপিএ-৫। ছোটবেলা থেকে গার্ল গাইডস, আবৃত্তি, ড্রয়িং, রচনা ও বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিতেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং মানুষের সামনে কথা বলার ভয় কাটিয়েছে।

নিউট্রিশন ও ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে গবেষণার মাধ্যমে সমাজে বড় অবদান রাখা সম্ভব। তাই ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে যেতে চান স্বপ্নীল।

স্বপ্নীলের পরামর্শ—নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, কৌশলী হোন, নিয়মিত পরিশ্রম করুন এবং ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে লেগে থাকুন। কারণ স্বপ্ন যত বড়ই হোক, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে একদিন তা বাস্তব হবেই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত