Ajker Patrika

কোনো আশা নেই, তবু কেন মানুষ সম্পর্কে দিনের পর দিন থেকে যায়

ডা. সানজিদা শাহরিয়া
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৬: ১৪
কোনো আশা নেই, তবু কেন মানুষ সম্পর্কে দিনের পর দিন থেকে যায়
ছবি: সংগৃহীত

এক ছাদের নিচেই বসবাস। তবু কেউ যেন কারও মুখের দিকেও ভালোভাবে তাকান না। প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি কোনো কথা বলা হয় না। শেষ করে মনের কথা বলেছেন, ভুলেই গেছেন। বাড়ি ফিরে দু’জনেই নিজের ফোনে ব্যস্ত। খাওয়ার সময়ও আলাদা করে ফেলেছেন। মানসিক সম্পর্কের পাশাপাশি শারীরিক সম্পর্কেও ভাটা পড়েছে। কখনও কি নিজের অজান্তে মনে প্রশ্ন জেগেছে, ‘কেন আছেন এই সম্পর্কে?’ সহজ প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর সহজ নয়। কেউ নির্যাতন সহ্য করে, কেউ অপমান মেনে নেয়, কেউ জানে সম্পর্কে আর ভালো কিছু নেই–তবুও থাকে। কারণ ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি মস্তিষ্কের জৈবিক প্রতিক্রিয়া, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা, সামাজিক কাঠামো আর প্রজন্মান্তরের ক্ষতের এক জটিল মিথস্ক্রিয়া।

কারণ কী হতে পারে

সবচেয়ে বড় কারণ ট্রমা বন্ডিং। নির্যাতন আর মাঝে মাঝে পাওয়া ভালোবাসার চক্রে মস্তিষ্কে ডোপামিনের অনিশ্চিত ঝলক তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলে অনিশ্চিত পুরস্কার বা ইন্টারমিটেন্ট রিইনফোর্সমেন্ট; যা জুয়ার আসক্তির মতোই শক্তিশালী।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় ক্রিমিনোলজিস্ট ডক্টর ম্যাগস লেসিয়াক ১৮ জন দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার নারীর সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখান, নির্যাতকরা সচেতনভাবে এই বন্ধন তৈরি করে। প্রথমে অতিরিক্ত ভালোবাসা, নিজের শৈশবের ট্রমার গল্প, তারপর নিষ্ঠুরতা, আবার ভালোবাসায় ফেরা। গবেষক বলছেন, ‘নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির নির্যাতকের প্রতি টান পড়া কোনো নিষ্ক্রিয় ট্রমা-প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি নির্যাতনকারীর আচরণের ফল, যেখানে প্রথমে অতিরিক্ত ভালোবাসা, তারপর নিষ্ঠুরতা, আবার ভালোবাসায় ফেরার চক্রে মস্তিষ্কে ডোপামিনের অনিশ্চিত ঝলক তৈরি হয়।’

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের শেফিল্ডে রিচার্ড হেলসের বিরুদ্ধে মামলায় ভিকটিম আদালতে বলেন, ‘তুমি আমাকে বোঝালে যে ভালোবাসা মানে ব্যথা সহ্য করা এবং যাই হোক না কেন, তুমি যাই করো না কেন, সব সহ্য করে শেষ পর্যন্ত পাশে লেগে থাকা।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু অপেক্ষা করছিলাম, আবার সব ভালো হয়ে যাবে।’

দ্বিতীয় কারণ, ডুবন্ত খরচের ভ্রান্তি বা সাংক কস্ট ফ্যালাসি। সম্পর্কে যত সময়, আবেগ, শ্রম দেওয়া হয়, ছাড়ার সিদ্ধান্ত তত কঠিন হয়। মানুষ ভাবে, এতদূর এসেছি, ছেড়ে দিলে সব বৃথা যাবে।’ সঙ্গে যোগ হয় ক্ষতি-বিমুখতা বা লস অ্যাভার্শন; যাতে হারানোর ভয় পাওয়ার আশার চেয়ে বেশি কাজ করে।

বলিউড অভিনেত্রী সেলিনা জেটলি ১৫ বছর নির্যাতনমূলক বিবাহে থাকার পর লিখেছেন, ‘নির্যাতন খুব কমই সহিংসতা দিয়ে শুরু হয়। শুরু হয় ভালোবাসা দিয়ে। তীব্রতা, প্রতিশ্রুতি, ধীরে ধীরে নির্ভরতা গড়ে ওঠা দিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘আশা আসক্তিকর। তার ছোট ছোট জানালা ভর করেই তুমি বেঁচে থাকতে শুরু করো।’

অন্যদিকে বলিউড তারকা রতী অগ্নিহোত্রী ৩০ বছর সহ্য করে বলেন, ‘আমি মনে মনে ভাবতাম, আমি ৫৪ বছরের এক নারী, আর আমি কেবল আরও বৃদ্ধ ও দুর্বল হব… আর একদিন মার খেতে খেতে মারা যাব।’ এখানে সন্তান, বিবাহের পবিত্রতা আর ভবিষ্যতের ভয়–ডুবন্ত খরচের তিনটি উপাদান স্পষ্ট।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট এই বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার অন্তরঙ্গ সঙ্গীর নির্যাতনের শিকার; ৬২ শতাংশ কখনো অভিযোগ করেননি; ৪৯ শতাংশ গত এক বছরে নির্যাতিত; ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হবে; অভিযোগ কেন্দ্র (ওসিসি) সম্পর্কে জানেন মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। যে নারীরা উপার্জন করেন, তাঁরা ২৮ শতাংশ বেশি অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার। স্বামীর আধিপত্য হারানোর ভয়েই সহিংসতা বাড়ে।

একই বছর আগস্টে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৪ শতাংশ মাদকাসক্ত স্বামী স্ত্রীকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করেছেন। তবুও নারীরা থাকেন দারিদ্র্য, লজ্জা, নীরবতা আর সামাজিক কলঙ্কের কারণে। আর এই চক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পরিচালিত হয়, আন্তঃপ্রজন্মগত ট্রমার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১-এর যুদ্ধ, দেশভাগ, চলমান রাজনৈতিক হিংসা—এসব গভীর আঘাত রেখে গেছে। যে শিশুরা পরিবারে নির্যাতন দেখে বড় হয়, তাদের স্নায়ুতন্ত্র সেই বিশৃঙ্খলাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেয়। পরে তারা হয় নিজেরা নির্যাতনকারী হয়, নয়তো নির্যাতন সহ্য করতে শেখে। বাংলাদেশে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতা এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে সংক্রমিত হয়।

বিশ্বের চিত্র কেমন?

বিশ্বব্যাপী চিত্রও ভয়াবহ। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে প্রতি ১০ মিনিটে এক নারী নিহত হয়েছেন অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যের হাতে; নিহতদের ৬০ শতাংশ ছিলেন ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর শিকার। বিশ্বে প্রায় ৭৩ দশমিক ৬ কোটি নারী (প্রতি তিনজনে একজন) জীবনে অন্তত একবার শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার। যুক্তরাষ্ট্রের এমএস ম্যাগাজিন (অক্টোবর ২০২৫)-এ ক্যাসি ভেনচুরার বিরুদ্ধে শন ‘ডিডি’ কম্বসের নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশের পর প্রশ্ন ওঠে—‘সে শুধু ছেড়ে দিল না কেন?’ উত্তর সম্পদ, ভয়, লজ্জা, ব্ল্যাকমেইল, নিম্ন আত্মমর্যাদা, সন্তান, আইনি পক্ষপাত, সংস্কৃতি, ধর্ম আর পরিবর্তনের আশা।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পিপল ম্যাগাজিন এ মেসি নিলি স্বীকার করেন, তাঁর প্রাক্তন সঙ্গী তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করতেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করানোর হুমকি দিতেন। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় ভিকটিমরা থেকে যায় কারণ তাদের মনে হয়, তাদের আর কোনো বিকল্প নেই।’ অর্থাৎ ধনী-গরিব, দেশ-বিদেশ—কেউই এই অদৃশ্য শিকল থেকে মুক্ত নয়।

যে কথা ছিল বলার

সম্পর্ক ছাড়ার অক্ষমতা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি মস্তিষ্কের ডোপামিন, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা, সামাজিক কলঙ্ক, আইনি অনিশ্চয়তা, সন্তানের ভয় আর প্রজন্মান্তরের আঘাতের এক জটিল বন্ধন। এই শিকল ভাঙতে দরকার নিরাপদ আশ্রয়, আর্থিক স্বাধীনতা, আইনি সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আর সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদল। নইলে মানুষ ‘ভালো সময়ের’ আশায় দিনের পর দিন থেকে যাবে, যদিও সেই ভালো সময় আর কখনো আসে না।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত