Ajker Patrika

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা যাবে কি না

ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী
গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা যাবে কি না
গর্ভবতী শারীরিক অসুস্থতা বোধ না করলে রোজা রাখতে পারেন। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।

প্রতিবছরের মতো এবারও রোজা শুরু হওয়ার আগে কয়েকজন গর্ভবতী জানতে এলেন, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা যাবে কি না। রোজা শুরুর পর অনেকে আসছেন রোজা রাখার কারণে সৃষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যা নিয়ে।

গর্ভবতী নারী রোজা রাখতে পারবেন কি

মুসলমানদের জন্য রোজা অবশ্যপালনীয় ধর্মীয় একটি বিধান। গর্ভবতী শারীরিক অসুস্থতা বোধ না করলে রোজা রাখতে পারেন। তবে গর্ভকালীন বা প্রসবের পরপরই রোজা রাখার ব্যাপারে কিছু শিথিলতা রয়েছে। রোজা রাখার ক্ষেত্রে খাদ্য, বিশ্রাম ইত্যাদি বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

গর্ভের প্রথম তিন মাস একটি বিশেষ হরমোনের প্রভাবে সাধারণত নারীর ক্ষুধামান্দ্য বা খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত বমির কারণে শরীরে পানিস্বল্পতা বা লবণজাতীয় পদার্থ কমে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। তাই গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে রোজা রাখতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাসে গর্ভস্থ শিশুর ওজন ক্রমাগত বাড়ে। এ জন্য মাকে সঠিক পরিমাণে খাবার খেতে হয়। সাধারণত গর্ভবতীর সুস্থতার সঙ্গে গর্ভের শিশুর সুস্থতা ওতপ্রোত জড়িত।

রোজায় গর্ভবতীর করণীয়

  • রমজানে রোজা রাখার জন্য প্রায় ১২ ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হয়। এরপর ইফতারের খাবারটা হবে শক্তিদায়ক কিন্তু সহজে পরিপাকযোগ্য এবং রসাল।
  • খেজুর একটা চমৎকার পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ফল। এতে জটিল শর্করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি থাকে। তাই ইফতারের শুরুতে সামান্য পানি বা হালকা মিষ্টিজাতীয় শরবত পানের পর খেজুর খাওয়া ভালো।
  • দই-চিড়া খেলে অম্ল বা অ্যাসিড নিঃসরণের আশঙ্কা কম থাকে।
  • রসাল মৌসুমি ফল; যেমন শসা, তরমুজ ইত্যাদি পানিস্বল্পতা পূরণে সহায়ক। পাকা কলা বা পাকা পেঁপের পুষ্টিগুণ অতুলনীয়। এগুলো খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকেও রেহাই পাওয়া যায়।
  • ইফতারে ভাজাপোড়া খাবারগুলো এড়িয়ে চলা ভালো। ছোলা ভিজিয়ে রেখে কাঁচা অবস্থায় অথবা সেদ্ধ করে সালাদের সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে।
  • এরপর রাতের খাবারে থাকবে ভাত বা রুটি। ভাতের জন্য লাল চাল আর রুটির জন্য লাল আটা হলে ভালো। লাল চাল এবং লাল আটায় আঁশ ও পুষ্টি বেশি থাকে। আঁশ সমৃদ্ধ শর্করা। ফলে ধীরে ধীরে হজম হয়। এতে রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজ কমে যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে; পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রাণিজ আমিষ; অর্থাৎ মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি থাকবে খাদ্যতালিকায়। খেতে হবে টাটকা শাকসবজি।
  • প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে
  • সেহরির খাবারটাও রাতের খাবারের মতো হতে হবে। তবে এর সঙ্গে খেজুর নিয়মিত খাবার তালিকায় রাখলে দিনে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমার আশঙ্কা থাকে না।
  • আমাদের শরীরে দৈনন্দিন জীবনে ২৪ ঘণ্টায় অবস্থা বিশেষে কমপক্ষে ৩ লিটার পানির দরকার হয়। তাই ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ গ্লাস পানি বা পানিজাতীয় খাবার খেতে হবে। ফলে পানিস্বল্পতাজনিত উপসর্গ; যেমন মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো ইত্যাদির পাশাপাশি প্রস্রাবে সংক্রমণের আশঙ্কা কম থাকবে।
  • একজন সুস্থ গর্ভবতীর প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে অন্তত ২ ঘণ্টা করে এবং রাতে ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম দরকার। রোজার সময়েও তাঁকে এটা মেনে চলতে হবে। কারণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে গর্ভফুলের (প্লাসেন্টা) রক্ত চলাচল প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এতে গর্ভস্থ শিশুর পুষ্টির অভাব হবে এবং কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।
  • গর্ভধারিণীকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড, আয়রন এবং ভিটামিন জাতীয় ওষুধ খেতে হবে।
  • রোজার সময় গর্ভবতীকে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। এ সময় মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো, বমি ভাব বা বমি হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে রোজা না রাখাই ভালো। আর রোজা শুরুর আগে প্রত্যেক মায়ের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। চিকিৎসক তাঁর সার্বিক ইতিহাস, শারীরিক এবং প্রয়োজনে ল্যাব পরীক্ষা করে জানিয়ে দেবেন, গর্ভবতী রোজা রাখার উপযোগী কি না। সমস্যা থাকলে তিনি রোজা রাখবেন না। সন্তান প্রসবের পর সুবিধাজনক সময়ে তিনি এই রোজাগুলো রাখতে পারবেন।

লেখক: অধ্যাপক এবং স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, বিভাগীয় প্রধান, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত