Ajker Patrika

ডিজিটাল নেশা থেকে মুক্তি চান? জেনে নিন উত্তরণের পথ

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ০২ মে ২০২৬, ১৯: ২৪
ডিজিটাল নেশা থেকে মুক্তি চান? জেনে নিন উত্তরণের পথ
মডেল: মুন

ভেবে দেখুন তো সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম কোন কাজটি করেন আপনি? বেশির ভাগ মানুষের উত্তর হবে, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে দেখি কটা বাজে। ভোরের আলো ফোটার আগে মোবাইল ফোনটি হাতে তুলে নেওয়া আজ আমাদের অনেকেরই মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। স্ট্যাটিস্টার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব দেখাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের দৈনিক গড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১৪১ মিনিট। আপাতদৃষ্টিতে এটি সংযোগের মাধ্যম মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বিপর্যয়।

মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টার ও ডোপামিনের ফাঁদ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেশা অনেকটা মাদকের মতোই। আমেরিকান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অ্যানা লেম্বকের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অত্যধিক ব্যবহার মাদকাসক্তির সঙ্গে তুলনীয়। যখন আমরা কোনো পোস্ট করি এবং সেখানে ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ পাই, তখন আমাদের মস্তিষ্কের রিঅ্যাওয়ার্ড সেন্টার থেকে ডোপামিন নামক এক ধরনের ‘ফিল গুড’ হরমোন নিঃসৃত হয়। কিন্তু এ সুখ স্থায়ী হয় না। অতিরিক্ত স্ক্রলিংয়ের ফলে মস্তিষ্ক এই ডোপামিনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এর স্বাভাবিক উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যাকে লেম্বকে ‘ডোপামিন ডেফিসিট’ বা ডোপামিনের ঘাটতি বলে অভিহিত করেছেন। এই ঘাটতি মেটাতে আমরা আরও বেশি সময় মোবাইল ফোনের পর্দায় কাটিয়ে দিই, যা আমাদের মনোযোগ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিকের ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলে।

ব্রেন রট ও মনোযোগের সংকট

২০২৪ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে যুক্ত হয়েছে ‘ব্রেন রট’ শব্দযুগল। এর অর্থ হলো, তুচ্ছ বা উদ্দীপনাহীন কনটেন্ট দেখার ফলে মানুষের মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থার অবনতি। ক্রমাগত নোটিফিকেশনের বন্যায় মস্তিষ্ক কেবল সহজ ও দ্রুত পুরস্কার খুঁজতে থাকে। ফলে বই পড়া বা কোনো জটিল সমস্যা সমাধানের মতো গভীর ও সময়সাপেক্ষ কাজে মনোযোগ দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। বোস্টন চিলড্রেনস হসপিটালের সেন্টার অন মিডিয়া অ্যান্ড চাইল্ড হেলথের পরিচালক মাইকেল রিচ জানান, বর্ধনশীল মস্তিষ্ক ক্রমাগত নিউরাল সংযোগ তৈরি করে। স্ক্রিনের কৃত্রিম উদ্দীপনা বাস্তব জগতের তুলনায় মস্তিষ্কের বিকাশে অনেক কম ভূমিকা রাখে। তিনি মনে করেন, ‘একঘেয়েমি’ বা অলস সময় কাটানো প্রয়োজন। কারণ এর মধ্যেই সৃজনশীলতা ও কল্পনার জন্ম হয়।

নীল আলোর ছায়া ও ঘুমের বিড়ম্বনা

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকদের মতে, শোয়ার আগে স্মার্টফোনের নীল আলো বা ব্লু লাইট মস্তিষ্কে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। এটি ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীরা এর ফলে গভীর ঘুম বা আরইএম স্লিপ থেকে বঞ্চিত হয়। এটি দিনের তথ্যগুলো স্মৃতিতে জমা রাখার জন্য অপরিহার্য। ফলে তারা ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও আগের দিনের পড়া মনে রাখতে হিমশিম খায়।

ডুমস্ক্রলিং

নেতিবাচক বা বিপর্যয়কর সংবাদ ক্রমাগত স্ক্রল করার অভ্যাসকে বলা হয় ডুমস্ক্রলিং। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রিচার্ড মল্লিকা জানান, সংবাদের এই নেতিবাচক স্রোতে আমরা আশার বাণী খুঁজে পাই না। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে ডুমস্ক্রলিংয়ের অভ্যাস তাদের মানসিক সুস্থতা ও জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি কমিয়ে দেয়। ‘কম্পিউটারস ইন হিউম্যান বিহেভিয়র রিপোর্টস’-এ ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত ৮০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণা বলছে, ডুমস্ক্রলিং মানুষের মধ্যে অস্তিত্ববাদী উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। এর শারীরিক প্রভাবও কম নয়। ফলে মাথাব্যথা, বমি ভাব, পেশিতে টান এবং রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও হতে পারে।

সাইবার বুলিং ও অলীক সৌন্দর্যের হাতছানি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অনেক সময় মানুষের জীবনের হাইলাইট রিল বলা হয়। অন্যদের সাজানো জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো দেখে নিজেদের দৈনন্দিন জীবন তুচ্ছ মনে হতে থাকে। এ বিষয়টি ফোমো বা পিছিয়ে পড়ার ভয় বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া স্ন্যাপচ্যাট বা টিকটক ফিল্টারের মাধ্যমে নিজের চেহারার খুঁত লুকানোর প্রবণতা আমাদের আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো সাইবার বুলিং। এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে।

মস্তিষ্কে ডোপামিনের ঘাটতি মেটাতে আমরা আরও বেশি সময় মোবাইল ফোনের পর্দায় কাটিয়ে দিই, যা আমাদের মনোযোগ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিকের ভারসাম্য নষ্ট করে। ছবি: আজকের পত্রিকা
মস্তিষ্কে ডোপামিনের ঘাটতি মেটাতে আমরা আরও বেশি সময় মোবাইল ফোনের পর্দায় কাটিয়ে দিই, যা আমাদের মনোযোগ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিকের ভারসাম্য নষ্ট করে। ছবি: আজকের পত্রিকা

জেনে নিন উত্তরণের পথ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আগুনের মতো। এটি দিয়ে খাবার রান্না করা যায়, আবার এতে হাত পুড়েও যেতে পারে। তাই সচেতনভাবে এর ব্যবহারই আমাদের মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে দিতে পারে। যদি এই অভ্যাস আপনার দৈনন্দিন জীবনকে চরমভাবে ব্যাহত করে, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নিউরোসায়েন্টিস্ট এমিলি ম্যাকডোনাল্ড এবং মাইকেল রিচ এই ডিজিটাল গোলকধাঁধা থেকে মুক্তির কিছু উপায় বলে দিয়েছেন।

ঘুম থেকে উঠে প্রথম ১ ঘণ্টা মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকুন। সকালে আমাদের মস্তিষ্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে। এ সময় ডোপামিন স্পাইক সারা দিন মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করতে পারে।

অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন, যাতে মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রণে আপনি না থাকেন; বরং সেটি আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে।

পরিবারের সঙ্গে খাওয়ার সময় মোবাইল ফোন সরিয়ে রাখুন। শোয়ার অন্তত ১ ঘণ্টা আগে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করুন।

ভ্রমণ, বই পড়া, গান শোনা, হাইকিং, পেইন্টিং, পোষা প্রাণীর সঙ্গে হাঁটা বা বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি আড্ডা দেওয়ার মতো কাজে মন দিন।

আপনার তালিকার এমন অ্যাকাউন্টগুলো আনফলো বা আনফ্রেন্ড করুন, যেগুলো দেখলে আপনার মনে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়।

সূত্র: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, দ্য ডেইলি ডাইজেস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাকে ঢাকায় রেখো না, ঢাকার বাইরে নিয়ে যাও’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হঠাৎ রমনা থানা পরিদর্শন, ১০ মিনিটে যা যা করলেন

‘ছোট ভাইকে না মেরে ভাত খাবে না বড় ভাই’

আওয়ামী লীগের সাবেক ছয়বারের এমপি মোসলেম উদ্দিন মারা গেছেন

ইরানের সঙ্গে স্থল বাণিজ্য পথ খুলে দিল পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র কি মেনে নেবে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত