Ajker Patrika

ট্রেন্ডে থাকা ফাইবারম্যাক্সিং কী, জেনে নিন এর পুষ্টিগুণ এবং সঠিক উপায়

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ১১: ০৯
ট্রেন্ডে থাকা ফাইবারম্যাক্সিং কী, জেনে নিন এর পুষ্টিগুণ এবং সঠিক উপায়
প্রতিদিনের খাবার ও স্ন্যাকসে ফাইবারের (আঁশ) পরিমাণ বাড়িয়ে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি ফাইবার নিশ্চিত করার নামই ফাইবারম্যাক্সিং। ছবি: পেক্সেলস

সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ডার্ট ইটিং’ বা মাটি খাওয়া কিংবা ‘র মিল্ক’ বা কাঁচা দুধ পানের মতো অদ্ভুত ও ক্ষতিকর সব ট্রেন্ড আমরা হরহামেশা দেখি। এসবের ভিড়ে টিকটকের একটি ভিন্ন ট্রেন্ড (ফাইবারম্যাক্সিং) বা পুপম্যাক্সিং। এই ট্রেন্ড আবার বেশ ব্যতিক্রম। ড্যানিয়েল ফিশেল বা ল্যান্স বাসের মতো তারকারাও এই ট্রেন্ডের জোয়ারে ভাসিয়েছেন। তবে প্রশ্ন হলো, খাবারে ফাইবারের পরিমাণ সর্বোচ্চ করার এই পরামর্শ কতটা স্বাস্থ্যসম্মত? এই ট্রেন্ডে গা ভাসানোর আগে জেনে নিতে হবে এর পুষ্টিগুণ ও ফাইবারম্যাক্সিং করার সঠিক উপায়। ফাইবারম্যাক্সিং কোনো ক্ষতিকর ট্রেন্ড নয়। এটি দারুণ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হয়ে ওঠে, যদি আপনি তা সঠিক নিয়ম মেনে এবং শরীরের ভাষা বুঝে ধীরে ধীরে আপনার জীবনযাত্রায় যুক্ত করেন।

ফাইবারম্যাক্সিং আসলে কী

সহজ কথায়, প্রতিদিনের খাবার ও স্ন্যাকসে ফাইবারের (আঁশ) পরিমাণ বাড়িয়ে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি ফাইবার নিশ্চিত করাকেই ফাইবারম্যাক্সিং বলে। এর ফলে পরিপাকতন্ত্র পরিষ্কার হওয়া এবং নিয়মিত পেট পরিষ্কার হওয়ার বিষয়টিকে টিকটকাররা বলছেন ‘পুপম্যাক্সিং’। পুষ্টিবিদদের মতে, বেশির ভাগ সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড ক্ষতিকর হলেও এটি মূলত ইতিবাচক এবং বিজ্ঞানসম্মত অভ্যাস।

ফাইবার কেন শরীরের জন্য উপকারী

আমাদের শরীর ফাইবার হজম করতে পারে না। তবে এটি পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় মিরাকলের মতো কাজ করে। ফাইবার মূলত দুই প্রকার—

দ্রবণীয় ফাইবার: এটি পানির সঙ্গে মিশে পাকস্থলীতে জেলের মতো তৈরি করে। এটি হজমপ্রক্রিয়াকে ধীর করে, ফলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এ ছাড়া এটি রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এবং শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। হৃদ্‌রোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেও এটি কার্যকর।

অদ্রবণীয় ফাইবার: এটি পানির সঙ্গে গলে না। আমাদের কোলন বা অন্ত্রের মধ্য দিয়ে বর্জ্য নিষ্কাশন ত্বরান্বিত করে। এ ছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়ক। বর্তমানে তরুণদের মাঝে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি যেভাবে বাড়ছে, তা প্রতিরোধে এই ফাইবার অত্যন্ত জরুরি।

কতটুকু ফাইবার খাওয়া উচিত

আমেরিকান ডায়েটেটিক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, প্রতি ১ হাজার ক্যালরি খাবারের জন্য প্রায় ১৪ গ্রাম ফাইবার প্রয়োজন। সেই হিসাবে গড়ে নারীদের জন্য প্রতিদিন ২৫ থেকে ২৮ গ্রাম ফাইবার জরুরি। আর পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদের জন্য ২১ গ্রাম। পুরুষদের জন্য প্রতিদিন গড়ে ৩১ থেকে ৩৪ গ্রাম ফাইবার জরুরি। পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষদের জন্য ৩০ গ্রাম। কিন্তু আধুনিক ডায়েটের কারণে বেশির ভাগ মানুষ দৈনিক মাত্র ১০ থেকে ১৫ গ্রামের বেশি ফাইবার পান না।

ফাইবারম্যাক্সিং করার সঠিক উপায়

কোনো সাপ্লিমেন্টের চেয়ে প্রাকৃতিক খাবার থেকেই ফাইবার নেওয়া সবচেয়ে ভালো। আপনার ডায়েটে নিচের খাবারগুলো যুক্ত করে সহজে ফাইবারম্যাক্সিং করতে পারেন:

দ্রবণীয় ফাইবারের উৎস

ডাল ও শিম: কালো বিন, কিডনি বিন (রাজমা), মসুর ডাল, ছোলা।

শস্যদানা: ওটমিল, ওট ব্রান, বার্লি।

ফলমূল: খোসাসহ আপেল, নাশপাতি, কলা, সাইট্রাস ফল (কমলা/লেবু), অ্যাভোকাডো। একটি অর্ধেক অ্যাভোকাডোতে প্রায় ৫ গ্রাম ফাইবার থাকে।

সবজি: ব্রকলি, গাজর, মিষ্টিআলু।

বাদাম ও বীজ: ফ্ল্যাক্স সিড (তিসি), চিয়া সিড, সূর্যমুখীর বীজ ও কাঠবাদাম।

অদ্রবণীয় ফাইবারের উৎস

-লাল চালের ভাত, গমের আটার রুটি, গম ও ভুট্টার ভুসি।

-সবজির মধ্যে ফুলকপি, গ্রিন বিনস, খোসাসহ আলু, ঝিঙে, শসা এবং গাঢ় সবুজ শাক। যেমন পালং।

ফাইবার সাপ্লিমেন্ট

খাবার থেকে পর্যাপ্ত ফাইবার না পেলে চিকিৎসকের পরামর্শে ইসবগুলের ভুসি বা মেটামুসিলের মতো প্রাকৃতিক ফাইবার সাপ্লিমেন্ট ডায়েটে যোগ করা যেতে পারে।

ফাইবারম্যাক্সিংয়ের ঝুঁকি

ফাইবারম্যাক্সিংয়ের বিষয়টি ভালো হলেও অতি উৎসাহী হয়ে বেশি মানেই ভালো মনে করলে বিপদে পড়তে পারেন। পুষ্টিবিদদের মতে, দিনে ৭০ গ্রামের বেশি ফাইবার গ্রহণ করলে তা শরীরের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।

পেট ফাঁপা ও গ্যাস: ফাইবার যখন হজম না হয়ে কোলনে পৌঁছায়, তখন সেখানকার ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো একে ফারমেন্ট বা গাঁজন করে। এর ফলে হাইড্রোজেন, মিথেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস উৎপন্ন হয়। আপনি যদি হঠাৎ খাবারে ফাইবারের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দেন, তবে তীব্র পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটব্যথা ও ডায়রিয়া হতে পারে।

পুষ্টির শোষণে বাধা: অতিরিক্ত ফাইবার শরীরকে ক্যালসিয়াম বা আয়রনের মতো জরুরি খনিজ উপাদান শোষণে বাধা দিতে পারে।

বিশেষ স্বাস্থ্যঝুঁকি: আপনার যদি ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম, পরিপাকতন্ত্রের ইনফ্লামেশন কিংবা এসআইবিওর মতো পেটের সমস্যা থাকে, তবে অতিরিক্ত ফাইবার আপনার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেবে।

সুস্থভাবে ফাইবারম্যাক্সিং করবেন যেভাবে

ধীরে ধীরে শুরু করুন: প্রথম দিন থেকে হুট করে প্রচুর ফাইবার খাওয়া শুরু করবেন না। সপ্তাহে একটি করে উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার তালিকায় যোগ করুন এবং শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার সময় দিন।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন: ফাইবার স্পঞ্জের মতো পানি শুষে নেয়। তাই খাবারে ফাইবার বাড়ালে সেই অনুপাতে পানি পানের পরিমাণও বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত পানি না পান করলে উল্টো কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেটব্যথা দেখা দেবে।

বৈচিত্র্য রাখুন: শুধু এক প্রকার খাবার বা সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর না করে ফল, সবজি, ডাল ও দানাশস্যের মিশ্রণে একটি সুষম ডায়েট তৈরি করুন।

সূত্র: ফোর্বস, হেলথ লাইন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত