পাহাড়ের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য দেখার সুবর্ণ সময় বর্ষা, শরৎ ও হেমন্তকাল। সেই পাহাড় যদি হয় তিন পার্বত্য জেলায়, তাহলে তো কথাই নেই। এই সময়গুলোতে পাহাড় তার রূপের ডালি মেলে ধরে। চারপাশে সবুজ আর সবুজ।
এবার আমাদের অভিযান ছিল রাঙামাটি জেলার গহিনে সৌন্দর্যের আধার রাইক্ষং ঝরনা। দলে ছিলাম ছয়জন। বগা লেক থেকে ভোর সাতটায় আল্লাহর নাম নিয়ে জুতসই বাঁশের লাঠি সম্বল করে হাঁটা শুরু। ঢেউখেলানো সারি সারি পাহাড়, ছড়া-ঝিরি মাড়িয়ে শুধু এগিয়ে যাচ্ছি। কখনো দুই হাজার ফুট ওপরে কখনো-বা দেড় হাজার ফুট নিচে; এভাবেই চলছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চড়াই-উতরাই। কোথাও যে একটু নিশ্চিন্ত মনে জিরিয়ে নেব, শিকারি টাইগার জোঁকের কারণে সেই সুযোগটুকুও নেই।
বেশ কয়েক ঘণ্টা হাঁটার পর নাখজং পাড়ার দেখা পেলাম। সেখানে মুরংদের বসতি। বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের পাশাপাশি সঙ্গে নেওয়া মুড়ি-চানাচুর তেল দিয়ে মেখে বেশ মজা করে খাওয়া হলো। খাওয়া শেষে আবার হাঁটা। আজকের গন্তব্য পুকুরপাড়া। পাহাড় অরণ্যে হাঁটতে হয় গুটি গুটি পায়ে, চারপাশে তাকিয়ে, কখনোবা নয়নাভিরাম প্রকৃতি দেখে থমকে যেতে হবে, তবেই না পাওয়া যাবে পাহাড়ে ঘোরার আনন্দ। অবাক বিস্ময়ের মনের আনন্দে হেলেদুলে হাঁটছি আর ক্যামেরার শার্টার টিপছি। প্রকৃতির রূপে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি কখন যে পাহাড়ি মহিষা আর টাইগার জোঁক দেহ আলিঙ্গন করেছিল, টেরই পাইনি। কাপড় ভিজে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল যখন, তখন হুঁশ ফিরেছে।
বেলা ২টা ২০ মিনিটে রুমা খালের দেখা পাই। খালের পানিতে ছড়ানো-ছিটানো প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ছোট-বড় অসংখ্য পাথরের চাঁই, স্বচ্ছ শীতল পানি হাতে-মুখে দিয়ে, সঙ্গে থাকা চিড়া-গুড় দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিই। এবার পাথর আর পানি ডিঙিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা। এনোংপাড়ায় আসতে প্রায় সন্ধ্যা। ডানে তাকিয়ে দেখি বিশাল বিশাল গাছ আর জঙ্গলে ঘেরা উঁচু এক পাহাড়। পুকুরপাড়া যেতে হলে এই পাহাড়টি ডিঙোতে হবে। এবার হয়তো ঢাকা থেকে বয়ে আনা রশির বস্তা কাজে আসবে। আমাদের রাত করে পাহাড়-জঙ্গলে হাঁটার দারুণ মজার মজার সব অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু গাইড কেন যেন বেঁকে বসল! তার জোরালো আবদার রাতে এনোংপাড়াতেই থেকে যান।
রুমা খালে সাফসুতরা হয়ে এনোংপাড়াতেই থেকে যাই, রাতের খাবারে অর্ডার দেওয়া হলো বাঁশ কোঁড়লের ভাজি, ডাল আর পাহাড়ি মুরগির ভুনা, সঙ্গে ঢেঁকিছাঁটা জুমের চালের বইঠা ভাত। খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাই কিন্তু ঘুম আসে না। বাইরে ভরা জোছনার আলো খোলা জানালার ফাঁক গলে চোখে পড়ে। চারপাশের সুনসান নীরবতা খান খান করে কানে ভেসে আসে অবিরাম ধারায় বয়ে যাওয়া খালের পানির কলকল শব্দ। একরাশ হিমেল হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে যায়। মনের মাঝে প্রচণ্ড বাসনা জাগে ঘরের বাইরে বের হয়ে পূর্ণিমা উপভোগ করার। কিন্তু হায়, ততক্ষণে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।

মোরগডাকা ভোরে বিছানা ছাড়ি, জাগিয়ে তুলি সবাইকে। সামান্য দানাপানি পেটে দিয়ে ছুটি এবার মূল গন্তব্যে। গত সন্ধ্যায় দেখা উঁচু পাহাড়টিই ট্রেকিং করতে হবে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। পাড়া থেকে নেমে সামান্য দূরে গিয়েই শুরু হয় ট্রেকিং। আকাশছোঁয়া বৃক্ষ, শরীরে জড়িয়ে যাওয়া সব লতাগুল্ম আর ভয়ানক সব শিকারি জোঁক! এ যেন পাহাড় নয়, মনে হবে কোনো মৃত্যুপুরীর ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হাঁটার পর পেয়ে যাই সুমিষ্ট স্বচ্ছ পানির ধারা। দুই পাহাড়ের বুক চিরে অবিরাম গড়িয়ে পড়ে পানি।
২. স্যালাইন, খেজুর আর ছড়ার পানি পান করে আবারও হাঁটা। এবার দুই পাহাড়ের মাঝে সরু পথ দিয়ে যেতে হবে। কিছু দূর যেতেই দেখি গাছের পাতায় পাহাড়ের ভাঁজে ঝুরঝুরে পাথুরে মাটিতে পাহাড়ের সবচেয়ে ভয়ংকর টাইগার জোঁক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বন্ধু ইফতেখার ভয়ে শিশুদের মতো কেঁদেই ফেলল! কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হবে—এই দুর্গম নির্জন পাহাড়ের বিনা রক্তপাতে কিছু পাওয়া যাবে কি? যতটা সম্ভব দ্রুত হাঁটছি। দেহের রক্ত চোষা যে শুরু হয়ে গেছে, তা একটু-আধটু টেরও পাচ্ছি।
আনুমানিক প্রায় ২৫ ফুট ওপরে যাওয়ার পর আমাদের চোখ ছানাবড়া। এ কী দেখছি! দৃষ্টির সীমা যত দূর যায় শুধু সবুজে মোড়ানো দিগন্তছোঁয়া পাহাড়ের ঢেউ। পুকুরপাড়া আর্মি ক্যাম্পের পাদদেশেই বিশালাকার টলটলে পানির লেক। চারপাশে পাহাড়, মাঝখানে অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক লেক। সোনার অঙ্গ বেয়ে পড়া রক্ত মুছি আর মায়ের কথা মনে করি।
এবার প্রাংজাংপাড়া পেরিয়ে পুকুরপাড়া সুজন মাস্টারের কটেজের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। কটেজে কাঁধের ঝোলা রেখে দেশি পেয়ারা চিবিয়ে নব উদ্যমে আবার হাঁটি। ঘণ্টাখানেক নিচের দিকে হাঁটার পর শুনতে পাই সেই কাঙ্ক্ষিত কলকল রিমঝিম শব্দ। পায়ের গতি আরও বেড়ে যায়। দুই রাত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঘরে মুলি বাঁশের মাচায় ঘুমিয়ে প্রায় দুই দিন বন্ধুর পথে পাড়ি দিয়ে অবশেষে পেয়ে যাই বছরখানেক যাবৎ স্বপ্নে বোনা রুদ্ধশ্বাস সৌন্দর্যের রাইক্ষং ঝরনা। বিশাল জলরাশি সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে। অন্য যেকোনো ঝরনার চেয়ে রাইক্ষংয়ের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানির বহমান ধারার দৃশ্য এক জায়গা থেকে দেখা যায়। দুই পাশে সেগুন আর গর্জনগাছের ছায়াঘেরা উঁচু পাহাড়, তার মাঝে রাইক্ষং। এর পানি বেশ দূরে গিয়ে রুমা খালে পড়ে। সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে আমরা আনন্দে লুটোপুটি খাই। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে আপ্লুত হয়ে হেঁটে যাই ঝরনার শেষ প্রান্তে। দেশের ভেতর এত সুন্দর একটা ঝরনা আছে, ভাবতেই অন্য রকম লাগে।
ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান যাওয়া যায় বাসে। বান্দরবানের রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে রুমা বাজার পর্যন্ত লোকাল বাস সার্ভিস। রুমা আর্মি ক্যাম্পে নাম এন্ট্রি করে গাইড নিতে হবে।
রুমা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই করে নিতে হবে। যতটা সম্ভব শুকনা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। গাইডের নির্দেশনামতো স্থানীয়ভাবে চাল-ডাল সংগ্রহ করা যাবে। তাঁর পরামর্শে স্থানীয় গ্রামগুলোতে থাকতে হবে।

অনেকের ধারণা, রাতে টানা ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলেই স্বাস্থ্যের যত্ন শেষ। কিন্তু আধুনিক ঘুম গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। ঘুমের মোট সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা ঠিক কোন ধরনের ঘুম পাচ্ছি। বিশেষ করে ঘুমের যে সময়ে আমরা উজ্জ্বল বা বিচিত্র সব স্বপ্ন দেখি, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় র্যাপিড আই...
৩৩ মিনিট আগে
গোসল করতে পানিতে নামতে হয়, এটাই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু গোসল যদি হয় গাছপালা আর বন জঙ্গলের মাঝে, পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ আর চারপাশে পাখির ডাক শুনতে শুনতে? জাপানে এমনই এক অভ্যাসের নাম শিনরিন-ইয়োকু বা ফরেস্ট বাথিং। এখানে পানি দিয়ে শরীর ধোয়ার কোনো বিষয় নেই; বরং বনের পরিবেশ, বাতাস, গন্ধ, শব্দ...
৪ ঘণ্টা আগে
ভোরের দিকে হালকা ঠান্ডা লাগে ঠিকই। কিন্তু সকালে রোদের তাপে অতিরিক্ত ঘাম তো হচ্ছেই। সঙ্গে পুড়ে তামাটে হয়ে যাচ্ছে ত্বক। ফলে অতিরিক্ত ঘাম ও রোদের ক্ষতিকর রশ্মির প্রভাবে ত্বকের ক্ষতি কম-বেশি এ ঋতুতেও হচ্ছে। এই সময় অনেকের ত্বক নিস্তেজ, ক্লান্ত ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। শুধু রোদে পুড়ে ত্বক তামাটে বর্ণের...
৬ ঘণ্টা আগে
আমাদের আচরণ, জীবনযাত্রার পছন্দ কিংবা দৈনন্দিন অভ্যাস—এগুলো আমরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকি। কিন্তু সম্পূর্ণটাই কি আমরা নিয়ন্ত্রণ করি? এই বিষয়গুলো কিছুটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আর কিছুটা লুকিয়ে আছে শরীরের ভেতরের জিনের অদৃশ্য সংকেতে। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো, আমাদের ব্যক্তিত্ব বা পছন্দ শুধু পরিবেশ...
৮ ঘণ্টা আগে