Ajker Patrika

সম্পর্কে ফাটল ধরাচ্ছে ‘ওয়েলনেস গ্যাপ’: ভারসাম্য বজায় রাখার সহজ কৌশল

ফারিয়া রহমান খান 
সম্পর্কে ফাটল ধরাচ্ছে ‘ওয়েলনেস গ্যাপ’: ভারসাম্য বজায় রাখার সহজ কৌশল
সাম্প্রতিককালে সম্পর্কের সমীকরণে নীরবে ফাটল ধরাচ্ছে নতুন এক আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ; ওয়েলনেস গ্যাপ। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

দুজন মানুষের পছন্দ-অপছন্দ বা জীবনধারা আলাদা হওয়াটাই স্বাভাবিক। ভিন্ন মানসিকতা বা অভ্যাস সত্ত্বেও বহু দম্পতি বছরের পর বছর সুখে একসঙ্গে কাটিয়ে দেন। ছোটখাটো মতবিরোধ হলেও তা ভালোবাসায় বাদ সাধে না। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সম্পর্কের সমীকরণে নীরবে ফাটল ধরাচ্ছে নতুন এক আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ; ওয়েলনেস গ্যাপ।

‘ওয়েলনেস গ্যাপ’ কী

সহজ কথায়, ওয়েলনেস গ্যাপ হলো এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে দম্পতির মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা, শরীরচর্চা, খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের নিয়ম কিংবা সার্বিকভাবে নিজের যত্ন নিয়ে দৃশ্যমান বড় পার্থক্য থাকে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের সচেতনতা বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু এই স্বাস্থ্য সচেতনতাই কখনো কখনো সম্পর্কের জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ধরুন, সঙ্গীদের একজন কড়া ডায়েট মানেন, নিয়ম করে ভোরে জিমে যান, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলেন এবং সময়মতো ঘুমান। ওপাশে অন্য সঙ্গীর ডায়েটের কোনো বালাই নেই, রাত জেগে সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন এবং প্রক্রিয়াজাত ফাস্ট ফুডে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই দুই বিপরীতধর্মী অভ্যাসের ব্যবধানই সম্পর্কের ওয়েলনেস গ্যাপ।

যেখানে সমস্যা তৈরি করছে এই লাইফস্টাইল

ওয়েলনেস গ্যাপের কারণে যৌথ কোয়ালিটি টাইম কাটানোর সুযোগ ধীরে ধীরে কমে আসে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস
ওয়েলনেস গ্যাপের কারণে যৌথ কোয়ালিটি টাইম কাটানোর সুযোগ ধীরে ধীরে কমে আসে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

একই ছাদের নিচে থাকা সত্ত্বেও জীবনযাপনের এই ভিন্নতা দম্পতিদের দৈনন্দিন জীবনে নানা সামাজিক ও মানসিক জটিলতা তৈরি করে।

অবসর উদ্‌যাপনে দূরত্ব

ছুটির দিনে একজন চান প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে শরীরচর্চা বা ট্রেকিং করতে, আর অন্যজন চান বিছানায় শুয়ে অলস সময় কাটাতে। ফলে যৌথ কোয়ালিটি টাইম কাটানোর সুযোগ ধীরে ধীরে কমে আসে।

খাবারের টেবিলে অশান্তি

একজন প্রতিটি খাবারের ক্যালরি মেপে খান, আর অন্যজনের পছন্দ তৈলাক্ত ফাস্ট ফুড। যৌথ খাবারের সময়টি আনন্দদায়ক হওয়ার বদলে তা প্রতিনিয়ত তর্ক ও মানসিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অনাহূত উপদেশ ও বিরক্তি

সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় যখন স্বাস্থ্য সচেতন সঙ্গী অন্যজনকে ক্রমাগত পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। ‘এটা খেয়ো না’, ‘একটু হাঁটো’—এ ধরনের অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও নেতিবাচক সমালোচনা সম্পর্কের ভেতরে দূরত্ব, ক্ষোভ ও হীনম্মন্যতা তৈরি করে।

মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও অপরাধবোধের সৃষ্টি

যখন সম্পর্কের একপক্ষ শারীরিক সুস্থতা ও স্বাস্থ্যের উচ্চ শিখরে নিজেকে নিয়ে যান, তখন অন্য পক্ষের মনে একধরনের অলক্ষিত অপরাধবোধ কাজ করতে পারে। স্বাস্থ্য সচেতন সঙ্গীটি হয়তো ভাবেন যে তিনি সম্পর্কের উন্নতির জন্যই পরামর্শ দিচ্ছেন, কিন্তু অন্য সঙ্গী বিষয়টিকে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। ফলে শারীরিক অভ্যাসের এই অমিল দ্রুত মনস্তাত্ত্বিক ব্যবধানে রূপ নেয়।

ওয়েলনেস গ্যাপ কি তবে বিচ্ছেদের লক্ষণ?

সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, জীবনযাত্রা আলাদা মানেই কিন্তু সম্পর্কের পরিণতি বিচ্ছেদ নয়। সম্পর্ক শুধু হুবহু অভ্যাসের মিল দিয়ে চলে না, বরং তা টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সমঝোতার ওপর। আপনি নিজে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতেই পারেন, তবে সঙ্গীর ওপর নিজের পছন্দ জোরপূর্বক চাপিয়ে না দেওয়াই ভালোবাসার মূল শর্ত।

ভারসাম্য বজায় রাখার সহজ কৌশল

সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় রেখে এই দূরত্ব কমানোর কিছু বাস্তবসম্মত উপায় রয়েছে।

মধ্যপন্থা অবলম্বন

দুজনে মিলে কিছু মধ্যবর্তী অভ্যাস গড়ে তুলুন। যেমন সপ্তাহে চার দিন পুষ্টিকর ঘরোয়া খাবার খেয়ে ছুটির দিনে দুজনে মিলে পছন্দের রেস্তোরাঁয় যাওয়া।

আগ্রহকে সম্মান জানানো

একজন জিমে যেতে ভালোবাসলে অন্যজন তাঁর সঙ্গী হতে পারেন, অথবা একজন সিনেমা দেখতে চাইলে অন্যজনও সেখানে যোগ দিতে পারেন।

জোর জবরদস্তি বন্ধ করা

সঙ্গীকে খোঁচা না দিয়ে বা বিচার না করে নিজের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের ইতিবাচক প্রভাবগুলো তার সামনে বজায় রাখুন। চাপ না দিয়ে ভালোবাসার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করাই ভালো।

লাইফস্টাইল বা অভ্যাসের অমিল থাকা কোনো অপরাধ নয়। স্বাস্থ্য সচেতনতা নিশ্চিতভাবেই ভালো বিষয়, তবে তা যেন সঙ্গী বা সম্পর্কের ভালোবাসার চেয়ে বড় হয়ে না ওঠে।

সূত্র: ওগিলভি ও অন্যান্য

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত