Ajker Patrika

চোখের পলক বুজে পরক্ষণেই চমকে উঠছেন, কেন হয় এমন

ফিচার ডেস্ক
চোখের পলক বুজে পরক্ষণেই চমকে উঠছেন, কেন হয় এমন
জেগে থাকা অবস্থায় মস্তিষ্কের অনিচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ ঘুমের মোডে চলে যাওয়াকে মাইক্রোস্লিপ বলা হয়। ছবি: পেক্সেলস

ছোটবেলায় পড়তে পড়তে অনেক সময় পড়ার টেবিলে মাথা ঠেকে যেত ঘুমের ঘোরে। বড় হয়ে অনেকের কম্পিউটারে কাজ করতে করতে হঠাৎ মাথা নুয়ে পড়ে টেবিলে। এমনকি টেলিভিশন দেখার সময় চোখের পলক বুজে পরক্ষণেই চমকে ওঠেন কেউ কেউ। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ‘অন্যমনস্ক’ হয়ে যাওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে মাইক্রোস্লিপ। এটি এমন এক জটিল শারীরিক অবস্থা, যা আপাতদৃষ্টে সাধারণ মনে হলেও নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে মারাত্মক ও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

মাইক্রোস্লিপ কী

সহজ কথায়, জেগে থাকা অবস্থায় মস্তিষ্কের অনিচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ ঘুমের মোডে চলে যাওয়াকে মাইক্রোস্লিপ বলা হয়। এর স্থায়িত্বকাল সাধারণত ১ থেকে ১৫ সেকেন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে। মাইক্রোস্লিপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি এত দ্রুত ঘটে যে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এমনকি চোখের পাতা খোলা রেখেও একজন মানুষ মাইক্রোস্লিপের শিকার হতে পারেন। তবে এই সময়ে তাঁর মস্তিষ্ক চারপাশের কোনো তথ্য বা উদ্দীপনা বুঝে উঠতে পারে না। যেমন শব্দ বা দৃশ্য। এটি নারকোলেপসি নামক স্লিপ ডিজঅর্ডারের সঙ্গে আংশিক সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও সম্পূর্ণ এক নয়।

মাইক্রোস্লিপের প্রধান কারণসমূহ

ঘুমের ঘাটতি: মাইক্রোস্লিপের প্রধানতম কারণ হলো পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। রাতে ঠিকমতো ঘুম না হলে বা একটানা জেগে থাকলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং জোরপূর্বক নিজেকে সতেজ করতে কয়েক সেকেন্ডের এই সংক্ষিপ্ত ঘুমের আশ্রয় নেয়।

একঘেয়েমি বা কম উদ্দীপনা: শরীর সম্পূর্ণ পরিশ্রান্ত না থাকলেও যদি কোনো ব্যক্তি অত্যন্ত একঘেয়ে, পুনরাবৃত্তিমূলক বা কম উদ্দীপনাযুক্ত কাজ করেন, তবে মাইক্রোস্লিপ হতে পারে। যেমন সোজা রাস্তায় একটানা গাড়ি চালানো বা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো লেকচার শোনা।

শিফট ওয়ার্কার: অনেকে আছেন, যাঁরা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল শিফটে কাজ করেন, যেমন নাইট ডিউটি; তাঁদের স্বাভাবিক ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তারা সবচেয়ে বেশি মাইক্রোস্লিপের শিকার হন।

অন্যান্য স্লিপ ডিজঅর্ডার এবং ওষুধ: ইনসমনিয়া অর্থাৎ অনিদ্রা বা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না। এই ধরনের সমস্যা এই ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ, যা শরীরে তন্দ্রাচ্ছন্ন তৈরি করে, সেগুলোও মাইক্রোস্লিপের জন্য দায়ী হতে পারে।

ক্রনিক স্ট্রেস বা মানসিক চাপ: দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের কারণে শরীরে কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বাড়ে। এই ধরনের হরমোন স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত রেখে ঘুমের স্বাভাবিক চক্র বাধাগ্রস্ত করে।

বয়স ও দুপুরের ক্লান্তি: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঘুম পাতলা ও কম কার্যকরী হয়ে পড়ে, যা প্রবীণদের মাঝে মাইক্রোস্লিপের প্রবণতা বাড়ায়। এ ছাড়া সার্কাডিয়ান রিদমের কারণে দুপুরের খাবারের পর মানুষের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই অলসতা বা ক্লান্তি আসে, যাকে ‘আফটারনুন স্লাম্প’ বলা হয়। এই সময়েও মাইক্রোস্লিপ বেশি ঘটে।

লক্ষণসমূহ

-চোখের পাতা ভারী হয়ে আসা, ঘন ঘন পলক পড়া বা চোখ ধীরগতিতে নড়াচড়া করা।

-আচমকা মাথা ঝুঁকে পড়া বা পুরো শরীর ঝটকা দিয়ে ওঠা।

-কিছু সময়ের জন্য মনোযোগ হারিয়ে ফেলা বা ‘স্পেসড আউট’ অনুভব করা।

-গাড়ি চালানোর সময় রাস্তার শেষ কয়েক কিলোমিটারের কথা মনে করতে না পারা বা নির্দিষ্ট এক্সিট মিস করা।

কেন এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক

নিরাপদ পরিবেশে মাইক্রোস্লিপ হলে কোনো শারীরিক ক্ষতি হয় না। যেমন ঘরে বসে টিভি দেখার সময় এই ধরনের সমস্যা হতে পারে। তখন বিষয়টা বিপজ্জনক নয়। কিন্তু উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেমন দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, ভারী যন্ত্রপাতি চালানো বা সার্জারি করার সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনোযোগ হারিয়ে গেলে তা মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নাইট শিফটের কর্মীদের সকালে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি।

প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায়

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইক্রোস্লিপের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সর্বজনীন ওষুধ বা চিকিৎসা নেই। এটি দূর করার একমাত্র উপায় হলো প্রতিরোধ।

ঘুমের সময় ঠিক রাখা: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।

ভালো স্লিপ হাইজিন মেনে চলা: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ইলেকট্রনিকস ডিভাইস বন্ধ রাখুন। যেমন মোবাইল, ল্যাপটপ। ঘুমানোর ঘরটি যেন ঠান্ডা এবং অন্ধকার থাকে, সেই ব্যবস্থা করুন।

রুটিন তৈরি: ঘুমের আগে শান্তিদায়ক মিউজিক শোনা, বই পড়া বা কুসুম গরম পানিতে গোসল করার অভ্যাস করতে পারেন। শেষ বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন (চা-কফি) জাতীয় পানীয় এড়িয়ে চলুন।

সতর্কতা অবলম্বন: গাড়ি চালানোর সময় যদি মনোযোগ হারিয়ে যায় কিংবা রাস্তা ভুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে জোরাজুরি না করে গাড়ি নিরাপদ স্থানে থামিয়ে বিশ্রাম নিন অথবা অন্য কাউকে চালাতে দিন। মনোযোগ প্রয়োজন এমন কাজের আগে ঘুমের ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

যদি পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও আপনি প্রায়ই দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করেন এবং ঘন ঘন মাইক্রোস্লিপের শিকার হন, তবে কোনো অন্তর্নিহিত স্লিপ ডিজঅর্ডার আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র: স্লিপ ফাউন্ডেশন, ভেরি ওয়েল মাইন্ড

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিপিসির প্রধান কার্যালয়: ৫০ কোটিতে ভবন তৈরির পর কার্যালয় যাচ্ছে ঢাকায়

রাতভর উত্তাল চট্টগ্রাম: পুলিশের পোশাক পরিয়ে সরানো হয় ধর্ষণে অভিযুক্তকে, রাখা হয়েছে কোথায়?

তথ্য গোপন করে ১৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদে বহাল তিনি

স্থানীয় নির্বাচনে বড় পরিবর্তন: থাকছে না পোস্টার ও দলীয় প্রতীক, অক্টোবরে ভোটের প্রস্তুতি

চট্টগ্রামে শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ: অভিযুক্তকে উদ্ধারে গিয়ে অবরুদ্ধ পুলিশ, টিয়ার শেল-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত