
বাসে উঠেছেন, অফিসে পৌঁছেছেন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসবেন—সবকিছুই একদম স্বাভাবিক চলছিল। হঠাৎ হাতটা অভ্যাসবশত পকেটে বা ব্যাগে গেল। মোবাইল ফোন নেই! সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা মোচড় দিয়ে উঠল। সেটি আসলে হারিয়েছে, নাকি ঘরেই ফেলে এসেছেন; মাথায় ভিড় করতে থাকল একগাদা ভাবনা। এভাবেই একধরনের তীব্র মানসিক চাপ বা প্যানিক অ্যাটাক আপনাকে গ্রাস করে নিল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে আপনি একা নন, আমাদের অবচেতনেই এই ছোট্ট ডিভাইস এখন আমাদের শরীরের এবং অস্তিত্বের একটি অদৃশ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকার এই তীব্র ও অব্যাখ্যনীয় ভয়কে বলা হচ্ছে নোমোফোবিয়া। এটি মূলত নো মোবাইল ফোন ফোবিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ। আমেরিকার গবেষক চাগলার ইলদিরিম এবং আনা-পাউলা করেয়া এই আধুনিক মানসিক অস্থিরতা নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন। তাঁদের তৈরি করা ২০টি প্রশ্নের একটি মনস্তাত্ত্বিক সূচকে মূলত ৪টি মূল কারণ উঠে এসেছে, যা আমাদের মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকলে তীব্র উৎকণ্ঠায় ফেলে দেয়। এগুলো হলো,

যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতার ভয়
‘অন্যরা আমাকে কীভাবে খুঁজে পাবে?’ এই চিন্তা থেকেই তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়।
অনলাইন পরিচয় ও কানেকশন হারানোর ভয়
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা বাসে বা ক্লাসের বাইরে একা বসে থাকার সময় মোবাইল ফোন ছাড়া কী করতে হবে, তা বুঝতে না পারা।
তথ্যহীনতার অস্বস্তি
যেকোনো অজানা বিষয় মুহূর্তে গুগল করে জেনে নেওয়ার অভ্যাস বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ খিটখিটে হয়ে পড়ে।
সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা হারানোর ভয়
মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেলে বা ফোন না থাকলে কোথাও আটকে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করা।
যুক্তরাজ্যে ২ হাজার মানুষের ওপর ব্রিটিশ গবেষণা ও জরিপ সংস্থা ইউগভ এবং যুক্তরাজ্যের পোস্ট অফিসের যৌথ উদ্যোগে এই বিষয়ে একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। সেই সমীক্ষায় উঠে আসে, প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন কাছে না থাকলে, চার্জ শেষ হলে বা নেটওয়ার্ক না থাকলে চরম উদ্বেগ অনুভব করেন। ২০১৫ সালে ৪৩টি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি গবেষণাপত্র ‘সাইকিয়াট্রি রিসার্চ’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, পৃথিবীর প্রায় ২১ শতাংশ মানুষ তীব্র নোমোফোবিয়ায় ভুগছেন। অর্থাৎ, প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন মানুষ মোবাইল ফোন ছাড়া মারাত্মক মানসিক ট্রমার শিকার হন।
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ‘দ্য ফিজিওলজিক্যাল সোসাইটি’র একটি জরিপ চমকে দেওয়ার মতো তথ্য সামনে এনেছে। দুই শতাধিক মানুষের ওপর চালানো এই সমীক্ষায় জীবনের চাপযুক্ত মুহূর্তগুলোর তালিকা করতে বলা হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, স্মার্টফোন হারানোর ভয়টি মানুষের কাছে একটি হার্ট অ্যাটাক বা সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হওয়ার ভয়ের ঠিক পরেই অবস্থান করছে। এমনকি বিয়ে ঠিক করা বা বাড়ি বদল করার মতো জীবনের বড় সিদ্ধান্তের চেয়ে মানুষ মোবাইল ফোন হারানোকে বেশি মানসিক চাপযুক্ত বলে মনে করছে।
মেডিকেল সায়েন্সে একটি বহুল পরিচিত শব্দ আছে ফ্যান্টম লিম্ব সেনসেশন। ১৫৬৪ সালে ফরাসি সার্জন আমব্রোইস পারে প্রথম এটি নথিভুক্ত করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব সৈনিকের হাত বা পা কেটে বাদ দেওয়া হতো, তাঁরা দীর্ঘদিন পরও অবিকল সেই কেটে ফেলা হাত বা পায়ে ব্যথা, চুলকানি বা স্পর্শ অনুভব করতেন। মস্তিষ্ক সহজে মেনে নিতে পারে না যে তার একটি অঙ্গ আর নেই। আজকের নিউরোসায়েন্টিস্টরা বলছেন, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটছে! একে বলা হচ্ছে টুল এমবডিমেন্ট।
আমাদের স্নায়ুতন্ত্র শরীরের একটি নিখুঁত মানসিক মানচিত্র তৈরি করে রাখে। যখন আমরা বছরের পর বছর ধরে দিনরাত একটি মোবাইল ফোন স্পর্শ করি এবং স্ক্রল করি, তখন মস্তিষ্ক আমাদের ‘বডি স্কিমা’র মধ্যে সেটিকেও অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক ফোনটিকে হাতের একটি বর্ধিত অংশ বা কৃত্রিম অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। ফলে, ফোন যখন কাছে থাকে না, তখন আমাদের স্নায়ুতন্ত্র বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং একধরনের ফ্যান্টম সেনসেশন বা অলীক অনুভূতি তৈরি করে। অনেক সময় পকেটে ফোন না থাকলেও মনে হয়, এই বুঝি ফোনটা ভাইব্রেট করল বা কেউ মনে হয় কল দিল। এটি মূলত আপনার মস্তিষ্কের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টারই একটি অংশ।
স্মার্টফোন শুধু একটি সাধারণ যন্ত্র নয়, এটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমাদের পুরো পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত রাখে। ইন্টারনেট এখন মানুষের জন্য একটি বাহ্যিক ডিজিটাল স্নায়ুতন্ত্র হিসেবে কাজ করছে। এটি আমাদের সাধারণ জৈবিক শরীরের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে মহাবিশ্বের যেকোনো তথ্য প্রসেস ও রেসপন্স করার ক্ষমতা দেয়। তবে এই অপরিসীম ক্ষমতার একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। বড় বড় টেক জায়ান্ট এবং তাদের অ্যালগরিদম আমাদের এই মানসিক ও শারীরিক নির্ভরশীলতার সুযোগ নেয়। আমাদের অবচেতনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা ব্যবহারকারীর আচরণ এবং সিদ্ধান্তকে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিচালনা করে।
এই আসক্তি বা ভয়ের কথা শুনেই মোবাইল ফোন পুরোপুরি বর্জন করা আজকের যুগে কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। তথ্য পাওয়া, ব্যাংকিং, যোগাযোগ বা পেশাগত প্রয়োজনে স্মার্টফোন এখন অপরিহার্য। এর সমাধান লুকিয়ে আছে প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হওয়া এবং হিউম্যান-সেন্টার্ড টেকনোলজি বা মানবকেন্দ্রিক ডিজাইনের দাবি তোলার মধ্যে। এটি আমাদের গোপনীয়তা, স্বাধীনতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে আমাদের ক্ষমতায়ন করবে। আজকের দিনে আপনি কি আপনার মোবাইল ফোনটি ঘরে রেখে পুরো একটা দিন বাইরে কাটাতে পারবেন? যেখানে কোনো ম্যাপ থাকবে না, সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন থাকবে না, থাকবে না ব্যাটারির শতকরা হিসাব দেখার তাড়া। এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আপনাকে জানিয়ে দেবে, প্রযুক্তির অবস্থান আপনার জীবনে ঠিক কতটুকু, আর নিজের অজান্তেই ডিজিটাল দাসত্বের দিকে কতখানি এগিয়ে গেছেন।
সূত্র: বিবিসি, মিডিয়াম

প্রতিবারই চায়ে চিনি নেওয়ার সময় বা মিষ্টিজাতীয় কিছু খাওয়ার সময় অপরাধবোধে ভুগছেন? রোজই ভাবেন, আজ থেকে আর চিনি খাবেন না। কিন্তু নিজেকে করা এই প্রতিজ্ঞা রাখতে নিজেই হিমশিম খাচ্ছেন, তাই তো?...
৫ ঘণ্টা আগে
প্রায় সবারই চুলে কোনো না কোনো সমস্যা লেগেই থাকে। চুল পড়া, অসময়ে পেকে যাওয়া, খুশকি, রুক্ষভাব আরও কত কী! এসব সমস্যার সমাধান হিসেবে প্রতিদিন চুলের ওপর চলতে থাকে নানান নিরীক্ষা। এসব সমস্যা সমাধানে নারকেল তেল, আমলকী, পেঁয়াজের রস, অলিভ অয়েল ইত্যাদি উপকরণের নাম তো সবারই জানা। তবে চুলের নানান সমস্যা...
৭ ঘণ্টা আগে
ছুটির দিনে বিকেলে অতিথি এলে ঝটপট বানিয়ে নিতে পারেন সুস্বাদু একটি ডেজার্ট। আপনাদের জন্য শির খুরমার রেসিপি ও ছবি পাঠিয়েছেন রন্ধনশিল্পী আফরোজা খানম মুক্তা।
৯ ঘণ্টা আগে
২০২২ সালে ইউনেসকো ফরাসি বাগেটকে ‘অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই বাগেটই ফ্রান্সের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফরাসি ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, তবে কি ফরাসি টেবিল থেকে বাগেট অদৃশ্য হয়ে যাবে? বাইরে মুচমুচে আর ভেতরে মাখনের মতো নরম...
১ দিন আগে