Ajker Patrika

তিনবার ব্যর্থতার পর প্রশাসন ক্যাডারে জাহেদ

ক্যারিয়ার ডেস্ক
তিনবার ব্যর্থতার পর প্রশাসন ক্যাডারে জাহেদ
মো. জাহেদ হাসান।

মো. জাহেদ হাসান নাটোরের প্রত্যন্ত গ্রামের এক কৃষকের সন্তান। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে। একসময় টিউশনি করে পড়াশোনা ও সংসার চালিয়েছেন। করোনাকালে বেকার হয়ে পড়ে শুরু করেন বিসিএসের প্রস্তুতি। দিনরাত পরিশ্রম আর তিনবারের ব্যর্থতা পেরিয়ে অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন তিনি। তাঁর সংগ্রাম, সাফল্যের পেছনের গল্প বলেছেন তিনি নিজেই।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা

আমার শৈশব কেটেছে নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, বর্ষায় বিলে মাছ ধরা, কিংবা পুকুরে সাঁতার কেটে চোখ লাল করে বাড়ি ফেরা ছিল আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। সন্ধ্যায় হারিকেন বা কুপির আলো জ্বেলে পড়তে বসতাম। কারণ, তখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। আমার বাবা একজন কৃষক, আর মা গৃহিণী। দুই ভাইবোনের মধ্যে আমিই বড়। ছোটবেলা থেকে সংসারের নানান কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করতাম। সব মিলিয়ে শৈশবটা দারুণ ছিল।

শিক্ষাজীবন

গ্রামের নূরপুর মালঞ্চি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। এরপর ভর্তি হই ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজে। সেখানে মেসে থেকে পড়াশোনা করতাম। ২০১২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পাই। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ মেলেনি। অবশেষে ২০১৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হই। সেখান থেকে ২০১৭ সালে স্নাতক ও ২০১৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করি।

জীবনসংগ্রাম ও টিউশনি

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি নিজের খরচ চালাতে টিউশনি শুরু করি। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী বাড়তে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকায় রুম ভাড়া নিয়ে ব্যাচ আকারে পড়ানো শুরু করি। তখন আমার চিন্তাভাবনা জুড়ে শুধুই ছিল টিউশনি; আয়ও হতো বেশ ভালো। কিন্তু ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে তখন সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না।

বিসিএসের স্বপ্ন ও সিদ্ধান্ত

২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হলে আমার সব টিউশনি বন্ধ হয়ে যায় এবং আমি বেকার হয়ে পড়ি। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ৪০তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। তখন আমার অনেক বন্ধু পাস করে ক্যাডার হওয়ার পথে এগিয়ে গেলে আমার মনেও বিসিএসের স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে। এরপর ৪৩তম বিসিএসে জীবনের প্রথম আবেদন করি। এ ক্ষেত্রে আমার বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ ভাই এবং আমার সহধর্মিণী আমাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেছিলেন।

শূন্য থেকে প্রস্তুতি ও বাধা অতিক্রম

২০১৭ সালে অনার্স শেষ করে ২০২১ সালে এসে নতুন করে বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করা ছিল পাহাড়সম কঠিন। ৪৩তম প্রিলির আগে হাতে খুব কম সময় পেয়েছিলাম। বাজার থেকে এক সেট বই কিনে পড়া শুরু করি। দীর্ঘদিনের টিউশনির সুবাদে বিজ্ঞান, গণিত ও মানসিক দক্ষতায় আলাদা কোনো প্রস্তুতি নিতে হয়নি। অন্য বিষয়গুলো মোটামুটি পড়ে পরীক্ষার এক মাস আগে প্রচুর মডেল টেস্ট দিই, যা মূল পরীক্ষায় নেগেটিভ মার্কস কমাতে ভীষণ সাহায্য করে। লিখিত পরীক্ষার জন্য বিজ্ঞান ও গণিতে অতিরিক্ত সময় না লাগলেও বাংলা, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির জন্য অধ্যায়ভিত্তিক সংক্ষিপ্ত নোট তৈরি করি। নিয়মিত পত্রিকা পড়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খাতায় নোট করে রাখতাম। আমি কখনোই কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হইনি।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিন থেকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই পারিবারিকভাবে আমার বিয়ে হয় এবং ২০১৯ সালে প্রথম পুত্রসন্তানের বাবা হই। এত সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করা ছিল এক কঠোর জীবনসংগ্রাম।

বিসিএস প্রস্তুতির শুরুতে ভালো আয়ের টিউশনিগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া ছিল আমার জীবনের অন্যতম কঠিন সিদ্ধান্ত। সংসার চালাতে টিউশনির জমানো টাকাই ছিল একমাত্র সম্বল। সন্তান ও পরিবারকে সময় না দিয়ে পড়াশোনায় বুঁদ হয়ে থাকার জন্য রাতে পড়তাম আর দিনে ঘুমাতাম। আলাদা ঘরে একরকম নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছি। প্রতিদিন প্রায় ১৩-১৪ ঘণ্টা পড়াশোনা করতাম। এই দীর্ঘ যাত্রাটি শুধু আমার একা ছিল না: এটি ছিল আমার সহধর্মিণী, ছেলে এবং আমার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল।

কাঙ্ক্ষিত সাফল্য

৪৭তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন হয়েছিল এবং ভাইভাও আশানুরূপ না হওয়ায় ফলাফল নিয়ে আমার আলাদা কোনো প্রত্যাশা ছিল না। ফল প্রকাশের প্রায় ২০ মিনিট পর এক সহকর্মী ফোন করে রেজাল্ট প্রকাশের খবর দেন। পিডিএফ ডাউনলোড করে রোল মেলাতেই চোখ আটকে যায়—আমি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি! মুহূর্তের মধ্যে হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। সব নিশ্চিত হয়ে আমি ও আমার সহধর্মিণী অতীতের সব কষ্টের কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। বাবাকে ফোন করে জীবনের এই সবচেয়ে বড় আনন্দের খবরটি জানাই।

অনুপ্রেরণায় যাঁরা

৪৩, ৪৪ ও ৪৫তম বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার না পাওয়া এবং অন্যান্য চাকরির ভাইভা থেকে বারবার খালি হাতে ফেরায় হতাশা ঘিরে ধরত। তখন আমার সহধর্মিণী সব সময় সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে। আমার মা-বাবা নিজেরা পড়ার সুযোগ পাননি বলে বিসিএস সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না, তবে সব সময় আমাকে সমর্থন করেছেন।

নতুনদের জন্য পরামর্শ

যারা আমার মতো সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং টিউশনি করে পড়াশোনা চালাচ্ছে, তাদের উদ্দেশে বলব, প্রয়োজনের অতিরিক্ত টিউশনি না করে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে সময় দেওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকে নিয়মিত পত্রিকা পড়া, ইংরেজি ও গণিত চর্চা করা এবং মৌলিক বিষয়ভিত্তিক বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। বর্তমানে বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর খুব দ্রুতই লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ফলে প্রিলি ও লিখিত একসঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হবে। বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের ভুল ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা শুধরে নিতে হবে। সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে অদম্য ধৈর্য নিয়ে পরিশ্রম করে যেতে হবে। কখনই হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগদানের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নিজেকে প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল, সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান সেবক হিসেবে গড়ে তোলাই আমার মূল লক্ষ্য।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে নিজেকে প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল, সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান সেবক হিসেবে গড়ে তোলাই আমার মূল লক্ষ্য।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত