Ajker Patrika

ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট বৈশ্বিক বাণিজ্যে আগামীর সুযোগ ও নতুন কর্মসংস্থান

ক্যারিয়ার ডেস্ক
ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট বৈশ্বিক বাণিজ্যে আগামীর সুযোগ ও নতুন কর্মসংস্থান
মো. সালাউদ্দিন।

বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন আইন ইকোডিজাইন ফর সাসটেইনেবল প্রোডাক্টস রেগুলেশন বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সামনে একদিকে যেমন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, অন্যদিকে সম্ভাবনারও দ্বার খুলে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট।

সহজভাবে বলতে গেলে, একটি পণ্যের কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে উৎপাদনপ্রক্রিয়া, পরিবেশগত প্রভাব এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা-সংক্রান্ত সব তথ্য যখন একটি ডিজিটাল কিউআর কোড বা চিপের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়, তখন সেটিকেই ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট বলা হয়।

নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

ডিজিটাল কমপ্লায়েন্সের এই রূপান্তর বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। আগামী ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে চাকরির বাজারে ডিজিটাল কমপ্লায়েন্স স্পেশালিস্ট, সাসটেইনেবিলিটি ডেটা অ্যানালিস্ট এবং সাপ্লাই চেইন ট্রেসেবিলিটি কোঅর্ডিনেটরের মতো নতুন পদের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

আকর্ষণীয় বেতন ও দক্ষতার চাহিদা

এই নতুন খাতে বেতনকাঠামোও বেশ আকর্ষণীয়, যা তরুণদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে একজন জুনিয়র ডিজিটাল কমপ্লায়েন্স স্পেশালিস্টের বার্ষিক বেতন ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলারের মধ্যে। অভিজ্ঞ ডিরেক্টর পর্যায়ে তা ২ লাখ ৩০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে একজন সাসটেইনেবিলিটি স্পেশালিস্টের গড় বার্ষিক আয় প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তবে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই আয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ব্লক চেইন বা লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট সফটওয়্যারে দক্ষদের জন্য বহুজাতিক কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক অডিট ফার্মে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতদূর

বাংলাদেশে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা GIZ-এর সহায়তায় STILE-II প্রকল্পের মাধ্যমে জাতীয় ট্রেসেবিলিটি কৌশল প্রণয়নের কাজ চলছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর বিদ্যমান রেক্স সিস্টেমকে ভিত্তি করে একটি জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি বিজিএমইএ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে ব্লক চেইনভিত্তিক ডিপিপি সিস্টেমের পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে।

তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোকে এই প্রযুক্তির আওতায় আনা। বড় কারখানাগুলো ইতিমধ্যে ইআরপি এবং ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করলেও ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য সরকারি সহায়তা এবং বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জরুরি।

সফটওয়্যার ও প্রশিক্ষণের নতুন ক্ষেত্র

ডিজিটাল কমপ্লায়েন্সের এই পরিবর্তনে সফটওয়্যার ও ডেটা ইন্টিগ্রেশন হবে ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি। বর্তমানে বিশ্ববাজারে atma.io, Arianee এবং Kezzler-এর মতো প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে। বাংলাদেশের আইটি খাতও স্থানীয় শিল্পের উপযোগী সফটওয়্যার তৈরি করে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

রপ্তানি বাণিজ্যকে ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত করতে দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং BITM-এর মতো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান যদি সাপ্লাই চেইন অ্যানালিটিক্স ও ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটির ওপর বিশেষ কোর্স চালু করে, তাহলে বাংলাদেশ শুধু রপ্তানি খাতেই নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল কমপ্লায়েন্স অডিটিং বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।

পরিশেষে বলা যায়, কমপ্লায়েন্স এখন আর শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সফটওয়্যার ও ডেটানির্ভর আধুনিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল বাণিজ্যে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত