Ajker Patrika

করপোরেট জীবনে এগিয়ে যাওয়ার কার্যকর প্রস্তুতি

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের পরীক্ষার পর যে তরুণ প্রথম জীবনবৃত্তান্ত পাঠান কিংবা সদ্য করপোরেট অফিসে যোগ দেওয়া যে তরুণী নিজের পরিচয় তৈরি করতে চান, তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভালো চাকরি পাব কীভাবে? তবে কর্মজীবনের কয়েক বছর পর প্রশ্নটি বদলে যায়। তখন ভাবতে হয়, কীভাবে এমন একজন পেশাজীবী হওয়া যায়, যাকে প্রতিষ্ঠান সত্যিই প্রয়োজন মনে করে? বিস্তারিত লিখেছেন এসিআইয়ের কনজ্যুমার ডিজিটাল বিজনেসের হেড অব সেলস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন জি এম ফারিদ হোসেন

ক্যারিয়ার ডেস্ক
করপোরেট জীবনে এগিয়ে যাওয়ার কার্যকর প্রস্তুতি
জি এম ফারিদ হোসেন।

আমার ১৪ বছরের কর্মজীবনে এফএমসিজি, টেলিকম, ডিভাইস, লাইফস্টাইল, কনজ্যুমার ইলেকট্রনিকস, ফিনটেকসহ বিভিন্ন শিল্পে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এই পথ আমাকে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে শিখিয়েছে। ক্যারিয়ার কোনো সরল সিঁড়ি নয়; বরং এটি নদীর মতো। কখনো পথ বদলাতে হয়, কখনো অচেনা তীরে ভিড়তে হয়। যে তরুণ স্রোতের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন, তিনি শেষ পর্যন্ত অনেক দূর যেতে পারেন।

পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখুন

করপোরেট জগতে অভিযোজন যোগ্যতা বা অ্যাডাপ্টেবিলিটি এখন আর অতিরিক্ত কোনো গুণ নয়। এটি টিকে থাকার মৌলিক দক্ষতা। একটি শিল্পে যে অভিজ্ঞতা মূল্যবান, অন্য শিল্পে সেটির প্রয়োগের ধরন বদলে যেতে পারে। টেলিকমে গ্রাহককে বোঝার অভিজ্ঞতা এফএমসিজিতে বাজারের আচরণ বুঝতে কাজে লাগতে পারে। ডিভাইস ব্যবসায় চ্যানেল ম্যানেজমেন্টের শিক্ষা ফিনটেকে অংশীদার ব্যবস্থাপনায় কাজে আসতে পারে। তাই নতুন দায়িত্ব বা নতুন শিল্পকে ভয় না পেয়ে ভাবুন, আগের অভিজ্ঞতার কোন অংশটি এখানে নতুনভাবে কাজে লাগানো যায়।

ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ান

আজকের কর্মজগতে ডিজিটাল দক্ষতা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া কঠিন। ডিজিটাল দক্ষতা মানে শুধু কোনো সফটওয়্যার চালাতে পারা নয়; তথ্য পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কাজকে আরও কার্যকর করা এবং অনলাইনে পেশাদার যোগাযোগ বজায় রাখাও এর অংশ। একজন বিক্রয়কর্মী যদি শুধু মাসিক লক্ষ্যমাত্রা জানেন, কিন্তু কোন অঞ্চলে কেন বিক্রি কমছে, তা তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করতে না পারেন, তাহলে তাঁর সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়; বরং যে ব্যক্তি প্রযুক্তিকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন, প্রযুক্তি তাঁর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

শেখা কখনো বন্ধ করবেন না

বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ চাকরির দরজা খুলতে পারে; তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য দরকার ধারাবাহিক আপস্কিলিং। প্রতিবছর নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, গত বছর আমি কী শিখেছি? আগামী বছর কোন দক্ষতা আমাকে আরও কার্যকর করবে? ব্যবসায়িক যোগাযোগ, ডেটা বিশ্লেষণ, উপস্থাপনা, নেতৃত্ব এবং ইংরেজি ও বাংলায় পরিষ্কারভাবে লেখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হয়। প্রতিদিন অল্প সময় পড়া, অভিজ্ঞ সহকর্মীর কাজ পর্যবেক্ষণ করা কিংবা বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে নিজেকে বাধ্য করা অনেক সময় দামি প্রশিক্ষণের চেয়েও বেশি কার্যকর।

বিক্রয় হতে পারে ব্যবসা শেখার স্কুল

আমার কাছে বিক্রয় ও বিতরণ অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ মূল্য আছে। বিক্রয় আপনাকে মানুষের কথা শুনতে শেখায়। বিতরণ শেখায়। কাগজে একটি কৌশল যত চমৎকার হোক; দোকানদার, পরিবেশক, মাঠকর্মী এবং গ্রাহকের বাস্তবতা না বুঝলে সেটি সফল হয় না। বিক্রয় পেশা তরুণদের প্রত্যাখ্যান সামলাতে, দর-কষাকষি করতে, লক্ষ্য নির্ধারণ করতে এবং ফলাফলের দায় নিতে শেখায়। অফিসের আলো ঝলমলে কক্ষের বাইরে বাজারে যাওয়া, গ্রাহকের চোখে নিজের পণ্যকে দেখা এবং মাঠের মানুষের সঙ্গে কাজ করা ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপককে অনেক বেশি বাস্তববাদী করে তোলে। তাই বিক্রয়কে শুধু চাকরি হিসেবে নয়, ব্যবসা শেখার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখুন।

ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিন

কোনো ক্যারিয়ারই সব সময় সাফল্যের গল্প নয়। লক্ষ্য পূরণ না হওয়া, পদোন্নতি আটকে যাওয়া কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কর্মজীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। স্থিতিস্থাপকতা বা রেজিলিয়েন্স মানে কষ্ট না পাওয়া নয়; বরং কষ্টের মধ্যেও শিক্ষা খুঁজে আবার দাঁড়াতে পারা। ব্যর্থতার পর নিজেকে দোষারোপ না করে তথ্য বিশ্লেষণ করুন। কোথায় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল? কোন সিদ্ধান্তটি ভিন্নভাবে নেওয়া যেত? পরের সুযোগের জন্য এখন কী তৈরি করতে হবে? ক্যারিয়ারে একটি দরজা বন্ধ হওয়া কখনো কখনো দিক পরিবর্তনের আমন্ত্রণ হয়ে আসে।

সম্পর্ক গড়ুন, নেটওয়ার্ক বাড়ান

এই পথে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। নেটওয়ার্কিং মানে শুধু পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানো নয়। এর অর্থ বিশ্বাসযোগ্য পেশাগত সম্পর্ক তৈরি করা। যাঁদের সঙ্গে কাজ করেন, তাঁদের সময়কে সম্মান করুন। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, প্রয়োজনে সহায়তা করুন এবং কৃতিত্ব ভাগ করে নিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পেশাগত উপস্থিতি গড়ে তুলুন। তবে প্রদর্শনের চেয়ে মূল্য দেওয়াকে গুরুত্ব দিন। আপনার লেখা, চিন্তা, কাজের নৈতিকতা ও আচরণ আপনার পেশাগত পরিচয় তৈরি করে। আপনার প্রকৃত নিরাপত্তা তৈরি হয় এমন দক্ষতা, চরিত্র ও শেখার ক্ষমতা দিয়ে, যা এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে আপনার সঙ্গে যেতে পারে।

তুলনা নয়, প্রস্তুতি হোক লক্ষ্য

করপোরেট জীবন কোনো দৌড় নয়। এখানে সবাইকে একই সময়ে একই জায়গায় পৌঁছাতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কারও যাত্রা দ্রুত হবে, কারও পথ বাঁক নেবে। কারও সাফল্য আসবে নীরবে। তাই তুলনা নয়, প্রস্তুতি হোক আপনার প্রতিদিনের অভ্যাস। বাজার বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, প্রতিষ্ঠানের কাঠামো বদলাবে। কিন্তু শেখার আগ্রহ, মানুষের প্রতি সম্মান, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং প্রতিকূলতার মুখে ফিরে দাঁড়ানোর সাহস কখনো পুরোনো হয় না। আজ থেকে এমন একটি দক্ষতা শিখুন, এমন একটি সম্পর্ক গড়ুন এবং এমন একটি কাজ করুন, যা আগামী দিনে আপনাকে আজকের চেয়ে শক্তিশালী করে।

সময়ের মূল্য বুঝুন

করপোরেট জগতে আরেকটি নীরব শক্তির কথা বলা জরুরি। সেটি হলো সময়ের মূল্য বোঝা। সময়মতো উপস্থিত হওয়া, প্রতিশ্রুত কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা এবং দেরি হলে আগেই জানানো—এসব ছোট আচরণ পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি তৈরি করে। নিজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শুধু সমস্যা জানাবেন না। সম্ভব হলে সমস্যার সঙ্গে দু-তিনটি সম্ভাব্য সমাধানও নিয়ে যান। এতে আপনার পরিণত চিন্তার পরিচয় মেলে। আবার সব বিষয়ে একা সফল হওয়ার চেষ্টা না করে কখন সাহায্য চাইতে হবে, সেটি শিখতে হবে। ভালো প্রতিষ্ঠান সেই মানুষকে মূল্য দেয়, যিনি নিজের কাজ জানেন, ভুল স্বীকার করতে পারেন এবং দলের সাফল্যকে ব্যক্তিগত কৃতিত্বের ওপরে স্থান দেন।

বাংলাদেশের তরুণদের সামনে আজ সুযোগের পরিসর আগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। দেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজার, আঞ্চলিক ব্যবসা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার নতুন পথ মিলিয়ে সম্ভাবনার দরজা এখন একাধিক। সুযোগ যত বাড়ে, প্রতিযোগিতাও তত তীব্র হয়। শুধু চাকরি খোঁজার প্রস্তুতি নয়, মূল্য তৈরি করার প্রস্তুতি নিন। আপনি কোন গ্রাহকের সমস্যা সমাধান করতে পারেন? কোন প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারেন? দলের ফল কীভাবে উন্নত করতে পারেন? আপনার ক্যারিয়ারের কেন্দ্রে থাকুক এসব প্রশ্ন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত