জর্ডানের পাহাড়ি পথ ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। পথটি মৃত সাগরের পূর্ব তীরের প্রধান সড়ক। এর একদিকে মৃত সাগর আরেক দিকে রুক্ষ পাহাড়। রাজধানী আম্মানের ব্যস্ততা তখন অনেক পেছনে পড়ে গেছে। রাস্তার দুই পাশে ধূসর-বাদামি পাহাড়, রুক্ষ প্রান্তর আর দূরে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট জনপদ।
গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলাম, কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে মানুষ শুধু দূরত্ব হিসাব করে। কত কিলোমিটার, কত ঘণ্টার পথ—এসবই হয়তো তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ইতিহাসের কিছু জায়গা আছে, যেখানে পৌঁছানোর আগে মনে হয়—আমরা আসলে সময়ের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। হজরত লুত (আ.) এর স্মৃতিবিজড়িত এই পথটিও তেমনই মনে হচ্ছে।
এবার আমাদের গন্তব্য কোরআনে বর্ণিত গভীর ও বেদনাবিধুর কাহিনির স্থান—হজরত লুত (আ.)-এর অঞ্চল। পবিত্র কোরআনের ১৪টি সুরায় নানাভাবে হজরত লুতের উদাহরণ এসেছে। কোরআনে তাঁর সময়ের মানুষকে ‘কওমে লুত বা লুতের জাতি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই সম্প্রদায়ের মানুষ অনৈতিক যৌনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। পবিত্র বাইবেলেও এ অঞ্চলের বর্ণনা আছে। তাতে এলাকাটিকে ‘সদোম’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেটা আসলে মৃত সাগরের আশপাশেরই অঞ্চল।
চলতে চলতে আমাদের গাড়ি এসে থামল একটি একতলা ভবনের সামনে। তাকিয়ে দেখি সাইনবোর্ডে লেখা—পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু স্থানের জাদুঘর। ভবনের সামনে নামতেই আমাদের সঙ্গী ও বন্ধু মোহাম্মদ নূর আলম বললেন, এই অঞ্চলের সঙ্গে হজরত লুত (আ.)-এর কাহিনি জড়িয়ে আছে। ওই দেখেন হজরত লুত (আ.)-এর কবর। তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের ওপরে ঝুলবারান্দার মতো দেখতে একটি ভূমি, সেটাই হজরত লুত (আ.)-এর কবরস্থান।
একদিকে মৃত সাগর, আরেক দিকে হজরত লুত (আ.)-এর কবরস্থান। কোরআনের সেই জনপদের কথা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। সেখানে এক নবী তাঁর সম্প্রদায়কে বছরের পর বছর অন্যায় থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন, আর মানুষ তাঁকে উপহাস করছে।
গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ চারপাশে তাকিয়ে রইলাম। জায়গাটি নিস্তব্ধ। পর্যটনকেন্দ্রের মতো কোলাহল নেই। মানুষের ভিড়ও নেই। দূরে পাহাড়ের ঢাল, সামনে শুষ্ক ভূমি। বাতাসে একধরনের গভীর স্থিরতা।
আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। সাংবাদিক হিসেবে আমি বহু ঐতিহাসিক স্থান দেখেছি। যুদ্ধক্ষেত্র দেখেছি, পুরোনো দুর্গ দেখেছি, রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখেছি। সেখানে ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বোঝা যায় স্থাপত্য দেখে, দেয়ালের ক্ষত দেখে, ভাঙা পাথর দেখে। কিন্তু এখানে এসে অনুভূতিটা অন্য রকম। কারণ এখানে ইতিহাসের চেয়ে বিশ্বাসই অনেক জোর এনে দেয়।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে পড়ছিল কোরআনের সেই কাহিনি। লুত (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে সতর্ক করছেন। কিন্তু তাঁরা শুনছে না। তিনি আবার বলছেন। তাঁরা উপহাস করছে। তিনি তাঁদের জন্য কল্যাণ চাইছেন। তারা তাঁকে শহর থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলছে।
একজন মানুষের পক্ষে কতটা কঠিন ছিল সেই সময়! সত্য বলা সব সময় সহজ নয়। বিশেষ করে যখন চারপাশের সবাই মনে করে—তুমিই ভুল।
হঠাৎ মনে হলো, কয়েক হাজার বছর আগের সেই দৃশ্য আর আজকের পৃথিবীর মধ্যে হয়তো খুব বেশি পার্থক্য নেই। আজও সমাজে এমন অনেক অন্যায় আছে, যেগুলো এতটাই পরিচিত হয়ে গেছে যে মানুষ আর সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে অস্বস্তিকর মনে হয়। তাই লুত (আ.)-এর গল্প শুধু একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের গল্প নয়, এটি একজন মানুষের একা দাঁড়িয়ে থাকার গল্পও বটে।
আমার সঙ্গী নূর আলম ধীরে ধীরে জায়গাটির বিভিন্ন অংশ দেখাচ্ছিলেন। তাঁর কথার মধ্যে ছিল শ্রদ্ধা, আবার ছিল অভ্যাসের স্বাভাবিকতা। তিনি হয়তো এই জায়গায় বহুবার এসেছেন। কিন্তু আমার কাছে এটিই প্রথম দর্শন। আমি ভাবছিলাম, স্কুলে ধর্ম বইয়ে যে নবীদের গল্প শুনেছি, তাঁদের একজনের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্থানে আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি—এটাই কি কম বিস্ময়ের?
বিদায়ের সময় আবার একবার পেছনে তাকালাম। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। পাহাড়ের গায়ে আলোর রং বদলাচ্ছে। শুষ্ক মাটি ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে উঠছে। আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করল। কিছু দূর যাওয়ার পর কবরস্থানটি আর দেখা গেল না। পাহাড়ের বাঁক তাকে আড়াল করে দিয়েছে।
আমরা ফিরে যাচ্ছি কয়েক হাজার বছরের পুরোনো একটি প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে। মানুষ যখন সবাই মিলে ভুলকে সত্য বলে মানতে শুরু করে, তখন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস কজনেরই-বা থাকে? হয়তো লুত (আ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তর সেখানেই আছে। তিনি ছিলেন একা, তবু তিনি নীরব ছিলেন না। যুগে যুগে ধর্মগ্রন্থ সে শিক্ষাই দিয়েছে।

নবুওয়াত পাওয়ার পর দীর্ঘ ১৩ বছর নিজ জন্মভূমি মক্কায় চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তাওহিদ ও সাম্যের বিপ্লবাত্মক বাণী প্রথমে গোপনে এবং পরে প্রকাশ্যে প্রচার করেন।
১ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
৫ ঘণ্টা আগে
কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) পরীক্ষার সনদ ও নম্বরপত্র সংগ্রহ সহজতর করতে জরুরি বিজ্ঞপ্তি ও নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। ১৪৩৮ হিজরি থেকে ১৪৪৭ হিজরি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১০টি পরীক্ষার সনদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে এই নতুন নির্দেশনা...
১৬ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
১ দিন আগে