Ajker Patrika

মুসলিমদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি চালু হয়েছিল যেভাবে

মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া
মুসলিমদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি চালু হয়েছিল যেভাবে

তৎকালীন প্রাক্‌-ইসলামি ও প্রারম্ভিক আরব সমাজে সুনির্দিষ্ট কোনো সন বা সাল গণনার নিয়ম ছিল না। আরবরা সাধারণত নিজ অঞ্চলের কোনো বড় বা স্মরণীয় ঘটনাকে—যেমন বিখ্যাত ‘হস্তীবাহিনীর বছর’—কেন্দ্র করে বছর গণনা করত।

সময়ের পরিক্রমায় প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের আলো আরবের সীমানা পেরিয়ে অনারবের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ভেঙে ইসলাম তখন এক বিশাল রাষ্ট্রীয় রূপ ধারণ করে। ষষ্ঠ বছরের ঘটনা; তখন ইরাকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)। তৎকালীন সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় বর্ষপঞ্জি না থাকায় খলিফার দরবার থেকে পাঠানো বিভিন্ন অফিশিয়াল চিঠিপত্র ও নির্দেশনায় কোনো তারিখ বা সালের উল্লেখ থাকত না। এর ফলে কোন ফরমান কখন পাঠানো হয়েছে এবং কোন নির্দেশটি আগে কার্যকর করতে হবে, তা নিয়ে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চরম বিভ্রান্তি ও ঝক্কি-ঝামেলার সৃষ্টি হতো।

এই প্রশাসনিক সংকট নিরসনে গভর্নর আবু মুসা আশআরি (রা.) খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর দরবারে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি নিজের পেরেশানির কথা উল্লেখ করে লেখেন—‘হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার পাঠানো রাষ্ট্রীয় ফরমানগুলোতে নির্ধারিত তারিখ না থাকায় দাপ্তরিক কাজ সুচারুভাবে পরিচালনা করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর একটি দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।’

খলিফার জরুরি পরামর্শ সভা

আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর বার্তাটি খলিফা ওমর (রা.) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিলেন। তিনি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করতে লাগলেন এবং মদিনার বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে একটি জরুরি পরামর্শ সভা (মজলিসুশ শুরা) আহ্বান করলেন। সেই ঐতিহাসিক সভায় উপস্থিত হলেন হজরত ওসমান গনি, হজরত আলী মুর্তজা, হজরত তালহা, হজরত জুবায়ের এবং হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর মতো দূরদর্শী ও চিন্তাবিদ সাহাবায়ে কেরাম।

সভায় উপস্থিত সাহাবিরা তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বিভিন্ন মতামত পেশ করতে লাগলেন। কেউ প্রস্তাব করলেন রোমানদের বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করার জন্য, আবার কেউ পারসিক কিংবা ইহুদিদের পঞ্জিকা অনুসরণের পক্ষে মত দিলেন।

কিন্তু আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের এই সমস্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি সাহাবিদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন—‘মুসলিমদের সবকিছুতেই যেমন স্বকীয়তা রয়েছে, বর্ষপঞ্জির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। আজ থেকে আমাদের নিজস্ব একটি স্বাধীন বর্ষপঞ্জি থাকবে, যা মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্যকে বহন করবে।’

হিজরতকে শুরুর বছর নির্ধারণ

খলিফার এই জাতীয় ও ধর্মীয় স্বকীয়তার সিদ্ধান্তকে উপস্থিত সকল সাহাবি একবাক্যে ও অকুণ্ঠ চিত্তে সমর্থন জানালেন। তবে এরপরই নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হলো—এই নতুন বর্ষপঞ্জির গণনা ঠিক কোন ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে শুরু হবে?

সভায় নানা ধরনের প্রস্তাব আসতে লাগল। কেউ প্রস্তাব করলেন নবীজি (সা.)-এর বরকতময় জন্মবছর থেকে গণনা শুরু করার। আবার কেউ নবুওয়াত লাভ কিংবা নবীজি (সা.)-এর ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত বছরকে শুরুর বছর হিসেবে ধরার প্রস্তাব দিলেন। কোনো কোনো সাহাবি যুক্তি দিলেন, যেহেতু নবীজি (সা.)-এর মদিনা হিজরতের মধ্য দিয়েই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, তাই বরকতময় সেই হিজরত থেকে গণনা করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।

এই জটিল মুহূর্তে হজরত আলী (রা.) অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও ঐতিহাসিক একটি তথ্য পেশ করলেন। তিনি বললেন—প্রিয় নবী (সা.) হিজরতের পঞ্চম বর্ষে খ্রিষ্টানদের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেছিলেন। নবীজি (সা.)-এর নির্দেশে আমি যখন সেই চুক্তিপত্রটি লিখেছিলাম, তখন সেখানে তারিখ হিসেবে ‘হিজরতের পঞ্চম বছর’ উল্লেখ করেছিলাম। সুতরাং, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই পবিত্র কর্মের অনুকরণে আমরা ‘হিজরত’-এর বছর থেকেই এই নতুন বর্ষপঞ্জির গণনা শুরু করতে পারি।

হজরত আলী (রা.)-এর এই চমৎকার ও দূরদর্শী যুক্তি সবার মনঃপূত হলো এবং সর্বসম্মতিক্রমে হিজরতের বছরকেই ইসলামি সনের প্রথম বছর হিসেবে নির্ধারণ করার ফয়সালা হলো।

বছরের প্রথম মাস হিসেবে ‘মহররম’ নির্বাচন

বছরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর শেষ প্রশ্নটি দাঁড়াল কোন মাসটি দিয়ে হিজরি বছরের সূচনা হবে? কিছু সাহাবি প্রস্তাব করলেন, যেহেতু নবীজি (সা.) রবিউল আউয়াল মাসে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, তাই রবিউল আউয়ালকেই বছরের প্রথম মাস করা হোক। আবার কেউ কেউ মুসলিম উম্মাহর পবিত্র ও বরকতময় মাস রমজানকে বছরের প্রথম মাস করার পক্ষে মত দিলেন।

এ পর্যায়ে হজরত ওসমান গনি (রা.) একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেন, বছরের শুরু ‘মহররম’ মাস থেকেই হওয়া উচিত। কারণ, নবীজি (সা.) সশরীরে রবিউল আউয়াল মাসে মদিনায় পৌঁছালেও, হিজরতের মূল পরিকল্পনা ও সাহাবায়ে কেরামকে মদিনায় হিজরতের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ তিনি মহররম মাসেই দিয়েছিলেন। এমনকি স্বয়ং নবীজি (সা.) এই মাসেই হিজরতের দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। হজরত আলী (রা.) এই মতের পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করলেন।

অবশেষে খলিফা হজরত ওমর (রা.) ঐতিহাসিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বললেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় বর্ষ গণনা হিজরত থেকেই শুরু হবে এবং এর শুরুর মাস হবে পবিত্র মহররম।’

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি ৩৯৩৪; ফাতহুল বারি: ৭ / ২৬৮; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া; ইসমাইল রেহান প্রণীত তারিখে মুসলিম উম্মাহ।

লেখক: শিক্ষক, জামিয়া আল-ইহসান, ঢাকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত