Ajker Patrika

মেক্সিকোতে মসজিদ গড়ে ওঠার অজানা ইতিহাস

তাসনিফ আবীদ
মেক্সিকোতে মসজিদ গড়ে ওঠার অজানা ইতিহাস

মেক্সিকো বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রাচীন মায়া সভ্যতার পিরামিড, মারিয়াচি ব্যান্ডের চঞ্চল সুর কিংবা রোমান ক্যাথলিক চার্চের সুউচ্চ মিনার। কিন্তু এই চিরচেনা লাতিন সংস্কৃতির আড়ালে দেশটির বুকে নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ইতিহাস—ইসলাম আগমনের গল্প। ১২ কোটি ৬০ লাখের বেশি জনসংখ্যার এই দেশে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ হলেও, আজ মেক্সিকোর উত্তর থেকে দক্ষিণে ছড়িয়ে রয়েছে ৪০টির বেশি মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার। ঔপনিবেশিক প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসন এবং দক্ষিণ মেক্সিকোর আদিবাসী মায়া জনগোষ্ঠীর নাটকীয় ধর্মান্তরের মধ্য দিয়ে মেক্সিকোর মাটিতে আল্লাহর ঘর গড়ে ওঠার ইতিহাস সত্যিই বিস্ময়কর।

অভিবাসন ও প্রথম মসজিদ

মেক্সিকোতে ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার সূচনা বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ লগ্নে হলেও, এর বীজ রোপিত হয়েছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আধুনিক তুরস্ক, সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন অঞ্চল থেকে একদল অভিবাসী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের কারণে মেক্সিকোতে পাড়ি জমান। এদের অনেকেই ইউকাতানের চাষাবাদে এবং মেক্সিকো সিটির বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। প্রথম দিকে আসা এই আরবদের মধ্যে মুসলিমরা ছিলেন সংখ্যালঘু এবং তীব্র ক্যাথলিক সামাজিক বলয়ের কারণে তাঁরা নিজেদের ইমান ও ইবাদত গোপনে ধরে রাখতেন।

দীর্ঘ কয়েক দশক ঘরোয়াভাবে ইসলাম চর্চার পর, মেক্সিকোর মাটিতে প্রথম স্থায়ী মসজিদের ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৮৯ সালে। কোহাদুলার তোরেওন শহরে মধ্যপ্রাচ্য (প্রধানত লেবানন) থেকে আসা প্রায় ৩৫টি অভিবাসী পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও অর্থায়নে নির্মিত হয় ‘সুরাইয়া মসজিদ’। এটিই মেক্সিকোর ইতিহাসের প্রথম সুনির্দিষ্টভাবে নির্মিত মসজিদ, যার স্থাপত্যে ইসলামের ঐতিহ্যবাহী গম্বুজ ও মিনারের সঙ্গে মেক্সিকান নির্মাণশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। মূলত শিয়া ধারার এই মসজিদটি মেক্সিকোতে ইসলামের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

মায়া সভ্যতায় ইসলামের আলো

মেক্সিকোর মসজিদ সংস্কৃতির সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অনন্য অধ্যায়টি রয়েছে দেশটির দক্ষিণ প্রান্তের পাহাড়ি রাজ্য চিয়াপাসে। ১৯৯৪ সালে চিয়াপাসে আদিবাসী বিদ্রোহের পর স্থানীয় মায়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সামাজিক ও ধর্মীয় আলোড়ন তৈরি হয়। এই সময়ে স্পেনের গ্রেনাডা থেকে আসা ‘মুরাবিতুন’ সুফি আন্দোলনের প্রচারকদের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ‘তজোতজিল মায়া’ আদিবাসীদের একটি বড় অংশ ইসলাম গ্রহণ করে।

আজ চিয়াপাসের সান ক্রিস্তোবাল দে লাস কাসাস শহরের পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অনন্য মসজিদ। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির মিশেলে এখানকার গ্রামীণ মসজিদগুলো অনেক সময় তৈরি হয়েছে সহজ-সরল কাদা-মাটির কুঁড়েঘরের আদলে। এর মধ্যে ‘মসজিদে কাউসার’ এবং ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠিত ‘ইমাম মালিক মসজিদ’ অন্যতম। ইমাম মালিক মসজিদটি কেবল একটি উপাসনালয়ই নয়, এটি কারিগরি কর্মশালা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যা মায়া মুসলিমদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী মোলিনা অঞ্চলের ‘তাহারা মসজিদ’ এবং গ্রামীণ মেঠোপথের ধারে অবস্থিত ‘মদিনা মসজিদ’ স্থানীয় তজোতজিল ভাষাভাষী মুসলিমদের প্রধান আশ্রয়স্থল।

মেক্সিকোর মাটিতে একটি মসজিদ টিকিয়ে রাখার পেছনে রয়েছে এক ভিন্ন আইনি বাস্তবতা। মেক্সিকোর সংবিধান অনুযায়ী, শতভাগ ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত যেকোনো ভবন সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়। এই জটিলতা এড়াতে মেক্সিকোর মুসলিম সমাজ তাদের মসজিদগুলোকে সরাসরি উপাসনালয় হিসেবে না দেখিয়ে ‘সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ বা ‘কমিউনিটি সেন্টার’ হিসেবে গড়ে তোলেন। এখানে নামাজের পাশাপাশি ভাষা শিক্ষা, আন্তধর্মীয় সংলাপ এবং সামাজিক সেবামূলক কাজ করা হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত