Ajker Patrika

পর্তুগালের যে মসজিদ মানুষের হৃদয় কাড়ে

ইউরোপের অন্যতম সুন্দর দেশ পর্তুগাল। এই দেশেরই রাজধানী লিসবনের কাম্পোলাইড এলাকায় অবস্থিত ‘লিসবন কেন্দ্রীয় মসজিদ’ (Mesquita Central de Lisboa)। পর্তুগালের বৃহত্তম এই মসজিদ অনন্য স্থাপত্যশৈলী, সামাজিক উদারতা ও মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে আজ মুসলিম-অমুসলিম-নির্বিশেষে সব মানুষের হৃদয় কেড়ে নিয়েছে।

কাউসার লাবীব
আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ১৮: ০৭
পর্তুগালের যে মসজিদ মানুষের হৃদয় কাড়ে
লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদ, পর্তুগাল। ছবি: সংগৃহীত

লিসবনে একটি মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করেছিল ১৯৬৬ সালে। সে বছর ১০ জন লিসবনবাসীর একটি দল (যার মধ্যে পাঁচজন মুসলিম ও পাঁচজন অমুসলিম ছিলেন) মেয়রের কাছে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি চান, কিন্তু পৌরসভা তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে ১৯৬৮ সালে মোজাম্বিকসহ বিভিন্ন পর্তুগিজ উপনিবেশ থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য লিসবনে আসতে শুরু করলে একটি মসজিদের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়।

অবশেষে ১৯৭৩ সালের আরব তেলসংকটের পর মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেলে ১৯৭৮ সালে পর্তুগিজ সরকার মসজিদ নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমতি দেয়। ১৯৭৭ সালে লিসবনের তৎকালীন মেয়র জমি বরাদ্দ করেন এবং ১৯৭৯ সালে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। দীর্ঘ সাত বছরের নির্মাণকাজ শেষে ১৯৮৫ সালে এই ঐতিহাসিক মসজিদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।

পর্তুগালের লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদের ভেতরের মনোরম দৃশ্য । ছবি: সংগৃহীত
পর্তুগালের লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদের ভেতরের মনোরম দৃশ্য । ছবি: সংগৃহীত

মসজিদটি নির্মাণে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, লিবিয়া, মিসর, পাকিস্তান ও ইরানের মতো মুসলিম দেশগুলো বিপুল আর্থিক অনুদান দেয়। বিশেষ করে, সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা খালিদ বিন আবদুল আজিজ আস-সাউদের নির্দেশনায় বড় অঙ্কের অনুদান আসে। ১৯৮১ সালে এই মসজিদের সম্মানে রাস্তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রুয়া দেল মস্কিতো’ বা ‘মসজিদ সড়ক’। তৎকালীন প্রিন্স সালমান বিন আবদুল আজিজ (পরে বাদশাহ) অনুদানের শেষ কিস্তি নিয়ে লিসবন আসেন এবং একটি মূল্যবান উপহার হিসেবে ‘কাবার কিসওয়া’ (কাবার গিলাফের অংশ) দেন, যা আজও মসজিদের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে।

স্থাপত্য ও নান্দনিকতা

২০১৯ সালের ‘রাফায়েল মানজানো পুরস্কার’ বিজয়ী স্থপতি আন্তোনিও মারিয়া ব্রাগা ও স্থপতি জোয়াও পাওলো কনসেইসাও-এর যৌথ নকশায় নির্মিত হয়েছে এই অসাধারণ মসজিদ। ঐতিহ্যবাহী ইসলামি স্থাপত্য ও পর্তুগিজ স্থানীয় শৈলীর এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে এখানে। একটি সুউচ্চ মিনার ও তিনটি গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদে রয়েছে সুদৃশ্য রিসেপশন হল, মূল প্রার্থনাকক্ষ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও একটি সুবিশাল অডিটরিয়াম। মসজিদের ভেতরের দেয়ালগুলো চমৎকার আরবি ক্যালিগ্রাফি ও সূক্ষ্ম নকশায় সজ্জিত। একসঙ্গে এক হাজারের বেশি মুসল্লি এখানে সালাত আদায় করতে পারেন। ২০১৫ সাল থেকে এই মসজিদের প্রধান ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাফেজ শায়খ ডেভিড মুনির।

লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদের পাশের সড়ক। মসজিদের সম্মানে বর্তমানে সড়কটির নাম ‘রুয়া দেল মস্কিতো’। ছবি: সংগৃহীত
লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদের পাশের সড়ক। মসজিদের সম্মানে বর্তমানে সড়কটির নাম ‘রুয়া দেল মস্কিতো’। ছবি: সংগৃহীত

মানবিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়ায় পর্তুগাল সরকার এই কেন্দ্রকে কোনো আর্থিক সহায়তা দেয় না। তা সত্ত্বেও স্থানীয় মুসলিমদের ও মুসলিম দেশগুলোর সহায়তায় মসজিদটি লিসবনের বুকে মানবতার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে।

  1. ২০১১ সাল থেকে এই মসজিদ একটি কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট দিনে সমাজের অভাবী মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া প্রতিবছর ক্রিসমাসের (বড়দিন) এক সপ্তাহ আগে থেকে এই মসজিদ লিসবনের প্রায় ২০০ জন অমুসলিম ও অভাবী মানুষকে প্রতিদিন খাবার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর বক্স উপহার দেয়। বছরজুড়ে বস্ত্রহীনদের মাঝে পোশাক বিতরণের কাজও চলে এখানে।
  2. রমজান মাসে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য ফ্রি ইফতারের আয়োজন করা হয় এই মসজিদে।
  3. এখানে ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং বর-কনেপক্ষের ভোজ আয়োজনের জন্য রয়েছে হালাল খাবারসমৃদ্ধ ডাইনিং হল। এ ছাড়া মরদেহ গোসল ও জানাজা শেষে পর্তুগাল সরকারের দান করা নিজস্ব মুসলিম কবরস্থানে দাফনের সুব্যবস্থা রয়েছে এখানে।

শিক্ষার আলো ছড়ানো পাঁচ পাঠশালা

লিসবন কেন্দ্রীয় মসজিদের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এর শিক্ষামূলক কার্যক্রম। এখানে মূলত পাঁচটি ভিন্ন ধারার শিক্ষা পরিচালিত হয়:

  • ১. শিশুদের বিদ্যালয়: পর্তুগালে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা প্রায় ৩০০ জন শিশুর জন্য এই স্কুল, যেখানে তাদের আরবি ভাষা ও ইসলামি নৈতিকতা শেখানো হয়।
  • ২. বড়দের নৈশকালীন আরবি শিক্ষা: প্রতি বৃহস্পতি ও শনিবার প্রায় ৪০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী এখানে আরবি ভাষা শিখতে আসেন। তাঁদের মধ্যে পর্তুগিজসহ বিভিন্ন দেশের অমুসলিম নাগরিকেরাও রয়েছেন, যাঁরা আরবি সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষিত।
  • ৩. নব মুসলিমদের পাঠশালা: প্রতি শনিবার নব মুসলিমদের জন্য বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করা হয়, যাতে তাঁরা ইসলামের বিধান ও নিয়মকানুন সহজে শিখতে পারেন।
  • ৪. নারীদের বিশেষ মাদ্রাসা: সপ্তাহজুড়ে নারীদের জন্য পরিচালিত এই শাখায় আরবি ভাষা এবং নারীদের ফিকহ ও মাসআলা-মাসায়েল শেখানো হয়।
  • ৫. কোরআন হিফজ মাদ্রাসা: ছোটদের জন্য সপ্তাহে দুই দিন (বুধ ও শনিবার) এবং বড়দের জন্য প্রধান ইমাম শায়খ মুনিরের তত্ত্বাবধানে সপ্তাহে দুই দিন (সোম ও বৃহস্পতিবার) পবিত্র কোরআন হিফজের ক্লাস চলে।

বিশ্বমঞ্চে ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে মসজিদের প্রভাব

এই মসজিদের মূল আদর্শ হলো—‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।’ কোনো জোর-জুলুম ছাড়াই কেবল ইসলামের সুমহান উদারতা দেখে প্রতি মাসে দুই থেকে তিনজন মানুষ এখানে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদের দৃষ্টিনন্দন মিনার ও গম্বুজ। ছবি: সংগৃহীত
লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদের দৃষ্টিনন্দন মিনার ও গম্বুজ। ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্তুগালের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতিরা দায়িত্ব গ্রহণের পর এই মসজিদ পরিদর্শনে আসেন, যা পর্তুগিজ সমাজে এই কেন্দ্রের গুরুত্ব প্রমাণ করে। ২০০৮ সালে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা পর্তুগাল সফরে এসে এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। সেটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম কোনো মসজিদ পরিদর্শন। পরিদর্শনের পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে একে তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

প্রতিবছর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থী এই মসজিদ পরিদর্শনে আসেন। অমুসলিমদের সরাসরি মুসলমানদের সঙ্গে কথা বলার এবং ইসলামকে জানার সুযোগ করে দিয়ে এই কেন্দ্র পর্তুগিজদের মন থেকে ইসলামোফোবিয়া ও সব ভুল ধারণা দূর করতে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করছে।

-মস্কপিডিয়া অবলম্বনে

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত