Ajker Patrika

রবের সঙ্গে বান্দার মেলবন্ধনে দোয়ার গুরুত্ব

সুমাইয়া আক্তার
রবের সঙ্গে বান্দার মেলবন্ধনে দোয়ার গুরুত্ব

‘দোয়া’ একটি আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ আহ্বান করা, সাহায্য প্রার্থনা করা বা সম্বোধন করা। আর ইসলামি পরিভাষায় দোয়া হলো—বান্দা কর্তৃক চরম বিনীত ও আকুলচিত্তে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে মহান রবের নিকট কল্যাণ কামনা ও সাহায্য প্রার্থনা করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের রব বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)। আবার হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার মৌলিকত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘দোয়াই হলো ইবাদত।’ (জামে তিরমিজি: ৩৩৭২)। অর্থাৎ, একজন মুমিনের পুরো জীবনটাই দোয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জীবনের বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার, পার্থিব কল্যাণ এবং পরকালীন আজাব থেকে মুক্তির প্রধানতম মাধ্যম হলো এই দোয়া।

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের অনেকের কাছে দোয়ার ধারণাটি অত্যন্ত সংকুচিত ও সুবিধাবাদী। বিপদ-আপদে পড়লে বা কোনো তীব্র প্রয়োজন দেখা দিলেই কেবল আমরা আল্লাহর দরবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। কিন্তু সংকট কেটে গেলেই রবের অশেষ অনুগ্রহের কথা বেমালুম ভুলে যাই। মানুষের এই সুবিধাবাদী মানসিকতার চিত্র তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। অতঃপর আমি যখন তার দুঃখ-দৈন্য দূর করি, তখন সে এমনভাবে চলতে থাকে যেন তাকে কোনো দুঃখ-দৈন্য স্পর্শই করেনি!’ (সুরা ইউনুস: ১২)। এমন আচরণ মানুষকে অকৃতজ্ঞতা ও সীমালঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দেয়। এর মূল কারণ হলো—দোয়ার গভীরতা অনুধাবন না করা এবং নবী-রাসুল ও সালাফদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করা।

পুসালাফদের জীবনে দোয়া

সৎকর্মশীল মুমিনদের জীবনে দোয়া হলো রবের নিকট আত্মসমর্পণ, নিয়ামতের জন্য শোকরগুজারি এবং বান্দা হিসেবে নিজের অক্ষমতার সার্বিক স্বীকৃতি। কোরআনে বর্ণিত পয়গম্বরদের দোয়ার দিকে তাকালে এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়:

হজরত মুসা (আ.)-এর দোয়ায় তাওয়াক্কুল: চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে যখন তিনি নিঃস্ব, তখন ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকলেন—‘হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই অবতীর্ণ করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী।’ (সুরা কাসাস: ২৪)। এটি রবের ওপর পূর্ণ নির্ভরতার এক বিরল দৃষ্টান্ত।

হজরত ইউসুফ (আ.)-এর শোকরগুজারি: জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে মিসরের রাজপ্রাসাদে পৌঁছে তিনি প্রার্থনা করলেন—‘হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, তুমিই দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দাও এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করো।’ (সুরা ইউসুফ: ১০১)। জীবনের চরম সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও তিনি ধন-সম্পদ না চেয়ে চাইলেন সুদৃঢ় ইমান ও রবের আনুগত্য।

রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার এই ব্যাপ্তি বোঝাতে গিয়ে শিখিয়েছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার রবের কাছে সমস্ত চাহিদার কথা বলে; এমনকি তার জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও যেন তা আল্লাহর কাছে চায়।’ (জামে তিরমিজি: ৩৬০৪)। হজরত আদম (আ.), ইবরাহিম (আ.), নুহ (আ.), আইয়ুব (আ.) থেকে শুরু করে আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর জীবনে দোয়া ছিল বান্দার আকুতি আর আল্লাহর দয়ার এক অপূর্ব সেতুবন্ধন।

আজকের যান্ত্রিক জীবনে নামাজের শেষে আমাদের মোনাজাতের তাড়াহুড়ো দেখে মনে হয় দোয়ার গভীরতা থেকে আমরা বহুদূরে সরে গেছি। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কোনো বস্তু নেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮২৯)। দোয়ার প্রতি এই অবহেলার কারণেই আমাদের ইবাদতের মাধুর্য হারিয়ে যাচ্ছে এবং দুনিয়ার মোহ হৃদয়কে গ্রাস করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত