Ajker Patrika

নবী (সা.)-এর প্রতি উম্মে আইমানের মাতৃস্নেহ

মোখতারুল ইসলাম মিলন
নবী (সা.)-এর প্রতি উম্মে আইমানের মাতৃস্নেহ

পবিত্র ধূলির ধরণিতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বরকতময় আগমন থেকে শুরু করে মহান রবের পানে প্রস্থান—সুদীর্ঘ এই পুরো জীবনপরিক্রমায় যে কয়জন ধন্য মানুষ তাঁকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখার ও পরম মায়ায় আগলে রাখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, তাঁদের অনন্য উচ্চতায় হজরত উম্মে আইমান (রা.)। যাঁর আসল নাম ছিল বারাকাহ বিনতে সালাবা। তিনি ছিলেন নবীজি (সা.)-এর শৈশবের আঁতুড়ঘরের প্রত্যক্ষদর্শী, কৈশোরের স্নিগ্ধ ছায়া, যৌবনের সুহৃদ এবং নবুওয়াতের আলোর প্রথম সারির অনুসারী।

আমিনা (রা.) যখন মহানবী (সা.)-কে গর্ভে ধারণ করেন এবং পরম মমতায় প্রসূতি প্রকোষ্ঠে জন্ম দেন, তখন সেই কক্ষে উপস্থিত থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রথম কোলে তুলে নেওয়ার ঐতিহাসিক সৌভাগ্য হয়েছিল এই বারাকাহর। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহর ইন্তেকালের পর থেকেই তিনি ছিলেন পরিবারের পরম বিশ্বস্ত আলো। মাত্র ছয় বছর বয়সে মদিনা থেকে ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক শুষ্ক মরুপ্রান্তরে যখন মা আমিনা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন সেই নির্জনতার বুকে একাকী এতিম শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে বুকে জড়িয়ে পরম মায়ায় মক্কায় দাদা আবদুল মুত্তালিবের কোলে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। মাতৃহীন শিশুর চোখের জল মুছে দিয়ে যিনি পরম স্নেহে মায়ের অভাব ভুলিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি এই উম্মে আইমান। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাই সারা জীবন তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণে রেখে বলতেন, ‘উম্মে আইমান আমার মায়ের পর আরেক মা।’

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বারাকাহকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দেন নবীজি (সা.)। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিবাহ হয় এবং কোলজুড়ে আসে পুত্র আইমান, যাঁর নামানুসারে তিনি ‘উম্মে আইমান’ (আইমানের মা) নামে প্রখ্যাত হন। প্রথম স্বামীর শাহাদাতের পর মহানবী (সা.) তাঁর জান্নাতি মর্যাদার সুসংবাদ দিয়ে সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জান্নাতি নারী বিয়ে করতে চায়, সে যেন উম্মে আইমানকে বিয়ে করে।’ অতঃপর নবীজি (সা.)-এর স্নেহের পালকপুত্র হজরত জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় এবং তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবি উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।

ইসলামের প্রভাতকালেই উম্মে আইমান (রা.) সত্যের দাওয়াত গ্রহণ করেন। মক্কার কাফেরদের অমানুষিক জুলুম সহ্য করেও, বয়সের ভার উপেক্ষা করে তিনি কেবল ইমানের আকুল তাগিদে পদব্রজে মরুভূমি পেরিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। উহুদ ও খায়বারের রক্তঝরা প্রান্তরেও তিনি সাহসের সঙ্গে আহত মুজাহিদদের শুশ্রূষা ও তৃষ্ণার্তদের পানি পানের সুমহান দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর উম্মে আইমান (রা.) শোকে বিহ্বল হয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিলেন। তাঁর এই সুগভীর ইমানি অনুভূতি ও দরদ দেখে খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.) আপ্লুত হয়ে যেতেন এবং প্রিয় নবীজি (সা.)-এর এই প্রবীণ জননীর সার্বিক দেখভাল করতেন।

হজরত ওসমান (রা.)-এর খেলাফতকালের শুরুর দিকে এই মহীয়সী নারী শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের প্রথম শ্বাস থেকে শুরু করে শেষনিশ্বাস পর্যন্ত—পুরো ৬৩ বছরের নবুওয়াতি আবহাওয়ার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও মাতৃস্নেহের এক বিরল মহিমায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত