Ajker Patrika

আতাউল্লাহ শাহ বুখারি (রহ.): এক সংগ্রামী সাধকের জীবনালেখ্য

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আন নোমান আরীফী
আতাউল্লাহ শাহ বুখারি (রহ.): এক সংগ্রামী সাধকের জীবনালেখ্য
আতাউল্লাহ শাহ বুখারি (রহ.)

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুসলিম সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে হজরত মাওলানা আতাউল্লাহ শাহ বুখারি (রহ.) একটি অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় বাগ্মী, রাজনীতিবিদ এবং একনিষ্ঠ ধর্মীয় নেতা। মজলিশ-ই-আহরার-ই-ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।

জন্ম ও বংশপরিচয়

আতাউল্লাহ শাহ বুখারি ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে বিহারের পাটনায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ মধ্য এশিয়ার বোখারা থেকে প্রথমে কাশ্মীরে এবং পরে পাটনায় স্থায়ী হন। শৈশবে মাতৃহীন হওয়ায় নানা-নানির আদরে তিনি প্রতিপালিত হন।

শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতা

আতাউল্লাহ শাহ বুখারি (রহ.) কোনো আধুনিক স্কুল বা কলেজে পড়েননি। তাঁর নানি ছিলেন ইংরেজদের শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার ঘোর বিরোধী। নানির কাছে আরবি ও ফারসি এবং নানার কাছে উর্দু ভাষা শেখার মাধ্যমে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। পরে পাঞ্জাবের অমৃতসরে মাওলানা নুর আহমাদ ও মুফতি মোহাম্মদ হোসাইনসহ প্রখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্যে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন তিনি।

রাজনৈতিক জীবন ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম

আতাউল্লাহ শাহ বুখারি (রহ.) ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ।

  • মজলিশ-ই-আহরার গঠন: মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সহায়তায় তিনি ‘মজলিশ-ই-আহরার-ই-ইসলাম’ গঠন করেন এবং এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন।
  • কারাবরণ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয়দের যোগ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আন্দোলন করায় ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কারাবরণ করেন।
  • জাতীয়তাবাদী আদর্শ: তিনি মহাত্মা গান্ধী, আবুল কালাম আজাদ এবং মাওলানা শওকত আলীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তিনি সংযুক্ত ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন এবং অহিংস পদ্ধতিতে আন্দোলন পরিচালনা করতেন।

সমাজ সংস্কার ও অর্থনীতিতে অবদান

একজন আদর্শ সমাজসংস্কারক হিসেবে তিনি মুসলিম সমাজের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করতে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানসমূহ:

  • ১. ব্যবসায়িক সচেতনতা: কুসীদজীবীদের (সুদখোর) কবল থেকে মুসলমানদের বাঁচাতে তিনি তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান।
  • ২. শিক্ষা বিস্তার: আহরার পার্টির মাধ্যমে তিনি অসংখ্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে কোরআনভিত্তিক আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়।
  • ৩. ধর্মীয় অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ: মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও ভেদাভেদ দূর করতে তিনি জনমত গড়ে তোলেন।

ব্যক্তিত্ব ও বাগ্মিতা

আতাউল্লাহ শাহ বুখারি ছিলেন সমকালের শ্রেষ্ঠ বক্তাদের একজন। তাঁর দীর্ঘ ৪ ঘণ্টার ভাষণেও শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে থাকতেন। তিনি রাজনীতিবিদের চেয়েও বড় পরিচয় বহন করতেন একজন দরদি ধর্মীয় নেতা হিসেবে। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের মাধ্যমে দ্রুত স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষপাতী ছিলেন।

ইন্তেকাল

দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং মুলতানে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের (মতান্তরে ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) ২১ আগস্ট ৭০ বছর বয়সে এই মহান নেতা ইন্তেকাল করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত