জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত ছিল এই ধরণি। মানুষ বিস্মৃত হয়েছিল মানবিকতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ন্যূনতম আলো। কন্যাসন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করার মতো নির্মমতা, গোত্রে গোত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর অন্যায়-অবিচারের পঙ্কিলতায় আরবের ধূলিকণা ছিল কলঙ্কিত। পাপাচারের সেই অন্ধকারে মূর্তি আর পেশিশক্তিই হয়ে উঠেছিল উপাসনার বস্তু ও শাসনের মূল ভিত্তি। বিশ্বমানবতা যখন হিদায়াতের দিশা হারিয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি, ঠিক তখনই মক্কার পবিত্র ভূমিতে সুপ্রভাতের সূর্য হয়ে জন্ম নেন এক মহামানব—যিনি কেবল কোনো বিশেষ ভূখণ্ডের জন্য নন, বরং সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন পরম রহমত হিসেবে।
তিনি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.)। তাঁর শুভাগমনে আরবের আকাশ-বাতাসে বেজে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব শান্তির সুর। শৈশব ও কৈশোর থেকেই তিনি ছিলেন সত্যবাদিতা ও সুচরিত্রের অনুপম প্রতীক; পরম শ্রদ্ধায় পুরো সমাজ তাঁকে ভূষিত করেছিল ‘আল-আমিন’ বা পরম বিশ্বস্ত উপাধিতে। চারিত্রিক মাধুর্য, অনন্য সততা ও নিরপেক্ষ ন্যায়পরায়ণতা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল অনন্য উচ্চতায়। ৪০ বছর বয়সে যখন তিনি নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব লাভ করেন, তখন তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় পাহাড়সম বাধা। নিজের আপনজনদের বিদ্রূপ, চরম বিরোধিতা আর সমাজের নানা চক্রান্তকে উপেক্ষা করে আল্লাহর নির্দেশে তিনি প্রথম তিন বছর গোপনে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করেন। এরপর সত্যের বাণীকে সর্বজনীন করতে তিনি সাফা পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনার উদাত্ত আহ্বান জানান।
কিন্তু মক্কার কাফের সমাজ তাঁর এই চিরকল্যাণকর আহ্বানকে মেনে নিতে পারেনি। শুরু হয় তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন। অমানসিক শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন, পাথর নিক্ষেপ, বয়কট ও লাঞ্ছনা—সবকিছুই তিনি অসীম ধৈর্য, পরম সহনশীলতা ও অনুকম্পার সঙ্গে মোকাবিলা করেন। সত্যের পথে তাঁর ইমানি দৃঢ়তা ছিল অটল। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিবকে সান্ত্বনা ও সুসংবাদ দিয়ে জানিয়ে দেন যে মক্কাবাসী এই সত্যকে প্রত্যাখ্যান করলেও ইয়াসরিবের (মদিনা) ত্যাগী মানুষেরা তাঁর আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
অবশেষে আল্লাহর নির্দেশক্রমে তিনি স্বদেশের মায়া ত্যাগ করে মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। এই হিজরত কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন ছিল না, বরং তা ছিল উৎপীড়িত মানবজাতির সার্বিক মুক্তির এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। মক্কা ত্যাগ করার মুহূর্তে পবিত্র বায়তুল্লাহর দিকে তাকিয়ে তাঁর অশ্রুসজল আঁখি ও হৃদয় নিংড়ানো আকুতি প্রমাণ করেছিল জন্মভূমির প্রতি তাঁর গভীর আকুলতা ও ভালোবাসার মাত্রা। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল তিনি মদিনায় পদার্পণ করেন। মদিনার আনসাররা তাঁকে অভূতপূর্ব ও উষ্ণতম অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন। এই হিজরতের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় মদিনাকেন্দ্রিক নতুন এক ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রের ভিত্তি, যার রাষ্ট্রপ্রধান হন স্বয়ং মহানবী (সা.)।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মহানবী (সা.)-কে সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী ও উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি মানুষকে পাপাচারের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং সুন্দর, সত্য ও সুপথের দিকে টেনে এনেছেন। তাঁর আবির্ভাবের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবাচরণের নৈতিক উৎকর্ষ সাধিত করা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চারিত্রিক গুণাবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ (সুরা আল-কলম: ৪)। তিনি নির্দিষ্ট কোনো জাতি, বর্ণ বা অঞ্চলের জন্য সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন সমগ্র কুলকায়েনাতের জন্য সর্বজনীন করুণা ও দয়ার আধার।
জীবনের সায়াহ্নে এসে ঐতিহ্যবাহী বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি মানবজাতির সার্বিক দিকনির্দেশনা দেন। সেদিনই ওহি নাজিল হয়—‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম।’ এই ঐশী বাণীর গভীরতা উপলব্ধি করে সাহাবিগণ বুঝতে পেরেছিলেন যে ধরণিতে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর অর্পিত দায়িত্ব সমাপ্ত হয়েছে এবং রবের ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় আসন্ন। বিদায় হজের অল্প কিছুদিন পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অন্তিম দিনগুলো শারীরিক কষ্ট ও উম্মতের ভাবনায় আচ্ছন্ন ছিল। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি নিজের কষ্টের কথা ভুলে উম্মতের হিদায়াত ও মাগফিরাতের জন্য ব্যাকুল প্রার্থনা করেছেন। অবশেষে ১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল এই মহান সত্তা ইহজগতের মায়া ত্যাগ করে রফিকে আলার (উচ্চতম বন্ধু আল্লাহ) সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। তাঁর প্রস্থানে মদিনার আকাশ-বাতাস গভীর শোকের ছায়ায় ঢেকে যায়, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া তৌহিদের আলো বিশ্বজুড়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিত ছিল মানবজাতির জন্য সর্বকালের সেরা আদর্শ। তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রিয় হাবিব, যিনি সত্য ও হিদায়াতের বার্তা মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন। নম্রতা, বিনয়, ক্ষমা, ধৈর্য ও অকৃত্রিম ভালোবাসাই ছিল তাঁর দাওয়াতের মূল শক্তি। কোনো প্রকার শক্তি প্রদর্শন বা বলপ্রয়োগ করে নয়, বরং নিজের নিষ্পাপ চরিত্র ও অপার দয়া দিয়ে তিনি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। তাঁর আদর্শের জ্যোতিতে আজ অন্ধকার পৃথিবী আলোর দিশা পেয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের অমর পঙ্ক্তিতে সেই আনন্দের সুরই প্রতিধ্বনিত হয়:
‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়।
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখ্বি যদি আয়।।
ধূলির ধরা বেহেশ্তে আজ, জয় করিল দিল রে লাজ।
আজকে খুশির ঢল নেমেছে ধূসর সাহারায়।।’

মানবসভ্যতার ইতিহাসে যেসব মহামানব তাঁদের কালজয়ী কর্ম ও আদর্শ দিয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একাধারে মহান শিক্ষক, সমাজসংস্কারক, ন্যায়বিচারক, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক...
১ ঘণ্টা আগে
পবিত্র কোরআনের জরাজীর্ণ পাতায় আলতো হাত বোলান তিনি। অক্ষরের প্রতি পরম মমতায় চোখে ভেসে ওঠে এক ঐশ্বরিক শ্রদ্ধা। তিনি পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির অধিবাসী হাফেজ ইমরান কুরাইশি। কোনো সরকারি অনুদান বা সংস্থার সাহায্য ছাড়া, স্রেফ নিজের ইচ্ছাশক্তি ও রবের প্রতি ভালোবাসাকে সম্বল করে চার বছর ধরে এক অনন্য...
১ ঘণ্টা আগে
‘ফি আমানিল্লাহ’ একটি আরবি বাক্য, যার অর্থ—‘আল্লাহর নিরাপত্তায়’ বা ‘আল্লাহ আপনাকে নিরাপদে রাখুন’। কাউকে বিদায় দেওয়া কিংবা বিদায় নেওয়ার সময়ে দোয়ার উদ্দেশ্যে এই বাক্যটি বলা যাবে। এতে কোনো বাধা নেই। তবে এ ক্ষেত্রে ইসলামের মূল শিক্ষা ও সুন্নাহর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
৭ ঘণ্টা আগে