Ajker Patrika

মুমিনের জীবনে মহানবী (সা.)-এর আদর্শের প্রভাব

ইমরান ফয়সাল
মুমিনের জীবনে মহানবী (সা.)-এর আদর্শের প্রভাব

মানবসভ্যতার ইতিহাসে যেসব মহামানব তাঁদের কালজয়ী কর্ম ও আদর্শ দিয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একাধারে মহান শিক্ষক, সমাজসংস্কারক, ন্যায়বিচারক, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং বিশ্বমানবতার মুক্তির পথপ্রদর্শক। সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা ও সহনশীলতার এক অনন্য রূপকার ছিলেন তিনি। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করার মাধ্যমেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের আগেই পিতাকে এবং শৈশবেই মাতাকে হারিয়ে চরম এতিম অবস্থায় বেড়ে উঠলেও তাঁর চরিত্রে কোনো হীনম্মন্যতা বা দুর্বলতা ছিল না। শৈশব থেকেই তাঁর নিখাদ সত্যবাদিতা ও অসাধারণ আমানতদারিতে মুগ্ধ হয়ে মক্কাবাসী তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করে। নবুওয়াত লাভের আগেই তাঁর এই নৈতিক চরিত্র সমাজজুড়ে চরম বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

মহানবী (সা.) ছিলেন দয়া ও পরোপকারের এক সজীব প্রতীক। অসহায়, দরিদ্র ও এতিমদের প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল অপরিসীম। নিজের জীবনজুড়ে তিনি প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা ও অভাবীদের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন। ব্যক্তিগত শত্রুতার ক্ষেত্রেও তিনি সব সময় প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমাকে অগ্রাধিকার দিতেন। দীর্ঘদিনের অমানুষিক নির্যাতন সত্ত্বেও মক্কা বিজয়ের দিন মক্কাবাসীর জন্য তাঁর ঘোষিত ‘সাধারণ ক্ষমা’ মানব ইতিহাসের এক বিরল ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তৎকালীন নারী ও দাস-দাসীরা সমাজে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের যথাযথ সম্মান, সম্পত্তিতে অধিকার এবং কন্যাসন্তানকে স্নেহে বড় করার ব্যাপারে কঠোর দিকনির্দেশনা দেন। পরিবার ও সমাজে দাস-দাসী ও দুর্বল শ্রেণির মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করে তিনি মানবিক মূল্যবোধের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

রাসুল (সা.)-এর অন্যতম প্রধান শিক্ষা ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। ধনী-গরিব, স্বজন-পরনির্বিশেষে সবার জন্য আইনি ও নৈতিক মানদণ্ড একই হওয়া উচিত বলে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। মদিনায় হিজরতের পর তিনি একটি সুশৃঙ্খল, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করেন। ‘মদিনা সনদ’-এর মাধ্যমে সকল ধর্মের মানুষের পারস্পরিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করে তিনি ইতিহাসের এক অনুকরণীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

মহানবী (সা.) জ্ঞান অর্জনকে প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যিক করেছেন। তাঁর শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং চরিত্র গঠন, সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও হিংসা-অহংকারমুক্ত জীবনের ওপর জোর দিয়েছে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ভৌত উন্নতির যুগেও আজকের পৃথিবী যখন হিংসা, স্বার্থপরতা, বৈষম্য ও অস্থিরতায় জর্জরিত, তখন মহানবী (সা.)-এর জীবনদর্শন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। তাঁর সততা আমাদের নীতিমান হতে শেখায়, তাঁর ক্ষমা আমাদের সহনশীল করে এবং তাঁর ন্যায়বিচার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস জোগায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত