
হিজরি বর্ষপঞ্জি মুসলিম উম্মাহর ইমানি চেতনা, ত্যাগ, ইবাদত এবং সোনালি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। পবিত্র কোরআনে বছরকে ১২টি মাসে বিভক্ত করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রতিটি মাসের নাম, অর্থ এবং নেপথ্যের ইতিহাস মুমিনের অন্তরকে এক বিশেষ রুহানি আবেশে উদ্বেলিত করে। আসুন জেনে নিই হিজরি ১২ মাসের নাম, তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক পটভূমি:
‘মহররম’ শব্দের অর্থ অতি সম্মানিত বা নিষিদ্ধ। এটি ইসলামের চারটি পবিত্র ও সম্মানিত মাসের (আশহুরে হুরুম) প্রথমটি। জাহেলি যুগ থেকেই এ মাসে রক্তপাত ও যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
তাৎপর্য ও আমল: মহররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় ‘আশুরা’। রমজানের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মহররম মাসেই সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত হুসাইন ইবনে আলী (রা.) ও তাঁর পরিবার-পরিজন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে সাহসিকতার সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন।
‘সফর’ শব্দের অর্থ শূন্য বা ফাঁকা। প্রাচীন আরবে মহররমের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর মানুষ যুদ্ধের ময়দানে বা খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ত এবং ঘরবাড়িগুলো জনশূন্য হয়ে যেত বলে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘সফর’।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: হিজরি ২ সনে ইসলামের প্রথম যুদ্ধ ‘আবওয়া’ এবং হিজরি ৭ সনে বিখ্যাত ‘খায়বার যুদ্ধ’ এই মাসেই সংঘটিত হয়েছিল। অনর্থক কুলক্ষণ বা অশুভ মনে করার কুপপ্রথাকে ইসলাম এ মাস থেকে দূর করেছে।
‘রবিউল আউয়াল’ অর্থ বসন্তের প্রথম ভাগ। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রাচীন আরবে এই নাম রাখা হয়েছিল।
তাৎপর্য ও ইতিহাস: এই মাসটি মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত আবেগ ও ভালোবাসার। কেননা এই ধরণিকে আলোকিত করে বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি, রাহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ মাসেই ধরাধামে তাশরিফ আনেন। এ ছাড়া এই মাসেই তিনি মক্কা মোকাররমা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় ঐতিহাসিক হিজরত সম্পন্ন করেন।
‘রবিউস সানি’ অর্থ বসন্তের দ্বিতীয় বা শেষভাগ। এ মাসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ ইবাদতের বর্ষপঞ্জি না থাকলেও এটি ইসলামের দাওয়াতি ও প্রতিরক্ষা ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: হিজরি ৩ সনে এই মাসেই সংঘটিত হয় ‘ফুরু’ অভিযান। বিশ্বনবী (সা.) এই অভিযানে সশরীরে অংশগ্রহণ না করে সাহাবিদের প্রেরণের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।
‘জুমাদাল উলা’ শব্দটির উৎপত্তি ‘জুমুদ’ বা শুষ্কতা ও পানি জমে যাওয়ার কাল থেকে। এটি গ্রীষ্ম ও তীব্র তাপদাহের সূচনাকে নির্দেশ করত।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এ মাসেই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের প্রথম সহধর্মিণী হজরত খাদিজা রা.)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ ছাড়া তাঁর শৈশবের অন্যতম অভিভাবক ও দাদাজান আবদুল মুত্তালিব এ মাসেই ইন্তেকাল করেন। ৮ হিজরিতে ঐতিহাসিক ‘মুতার যুদ্ধ’ এই মাসেই সংঘটিত হয়, যেখানে হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে প্রিয় নবীজি (সা.) ‘সাইফুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর তরবারি’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
এই মাসটি চরম শুষ্কতা বা শীতের শেষভাগকে নির্দেশ করে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ১৩ হিজরির ২২ জুমাদাস সানি ইসলামের প্রথম খলিফা, সিদ্দিকে আকবর হজরত আবু বকর (রা.) ৬৩ বছর বয়সে ওফাত লাভ করেন। একই দিনে হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ মাসেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ঐতিহাসিক ‘ইয়ারমুকের যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়েছিল।
‘রজব’ শব্দের অর্থ সম্মান বা মর্যাদা দেওয়া। এটি ইসলামের দ্বিতীয় সম্মানিত বা নিষিদ্ধ মাস। রজব মাস আগমন করলে নবীজি (সা.) রজব ও শাবানের বরকত এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছানোর দোয়া করতেন।
তাৎপর্য ও ইতিহাস: এ মাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও মহিমান্বিত ঘটনা হলো প্রিয় নবীজি (সা.)-এর ‘ইসরা ও মিরাজ’ (ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ)। মিরাজের এই রাতেই উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য উপহার হিসেবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়। ৯ হিজরিতে নবীজি (সা.)-এর জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ ‘তবুক অভিযান’ এই মাসেই পরিচালিত হয়।
‘শাবান’ শব্দের অর্থ ছড়িয়ে পড়া। রজব মাসের যুদ্ধবিরতি শেষে প্রাচীন আরবরা বিভিন্ন উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ত বলে এর নাম রাখা হয় শাবান।
তাৎপর্য ও আমল: রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে এই মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন। এ মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি ‘শবে বরাত’ বা নিছফ মিন শাবান হিসেবে পরিচিত—যে রাতে মহান আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং ক্ষমা ও নাজাতের সুসংবাদ দেন।
‘রমজান’ শব্দের অর্থ প্রখর তাপ বা দগ্ধ করা। প্রখর খরতাপে যেমন বস্তুর ময়লা শুকিয়ে যায়, তেমনি এ মাসের ইবাদত ও সিয়ামের মাধ্যমে মুমিনের জীবনের গুনাহসমূহ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
তাৎপর্য ও আমল: এটি হিজরি বর্ষের সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। ইসলামের চতুর্থ রুকন—পুরো এক মাসের ফরজ রোজা এ মাসেই পালন করা হয়।
মহিমান্বিত রাত: এ মাসেই মানবজাতির হিদায়াতের গ্রন্থ ‘পবিত্র কোরআন’ নাজিল হয়েছে। এ মাসেই রয়েছে ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
‘শাওয়াল’ অর্থ উত্তোলন করা বা বিকশিত হওয়া। রমজানের কঠোর সিয়াম সাধনার পর আত্মিক আত্মোন্নতিকে উচ্চে তুলে ধরার বার্তা নিয়ে আসে এই মাস।
তাৎপর্য ও সুনান: দীর্ঘ এক মাসের রোজার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিন আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুসলিমাকে ‘ঈদুল ফিতর’-এর মহান নিয়ামত ও আনন্দ উপহার দিয়েছেন। এ মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখা সুন্নত, যা পুরো বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব বহন করে। ৩ হিজরিতে ঐতিহাসিক ‘ওহুদের যুদ্ধ’ এ মাসেই সংঘটিত হয়েছিল।
‘জিলকদ’ শব্দের অর্থ বসা বা ক্ষান্ত হওয়া। এটি ইসলামের তৃতীয় সম্মানিত মাস। এ মাসে আরবরা যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থেকে নিজ ঘরে বসে থাকত এবং হজের প্রস্তুতি নিত।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ৫ হিজরিতে ঐতিহাসিক ‘খন্দকের যুদ্ধ’ (পরিখা খননের যুদ্ধ) এবং ৭ হিজরিতে বিশ্বনবী (সা.) ও সাহাবিদের ঐতিহাসিক ‘কাজা ওমরাহ’ আদায়ের ঘটনা এ মাসেই ঘটেছিল।
‘জিলহজ’ অর্থ হজের মাস। এটি হিজরি বছরের সর্বশেষ এবং চতুর্থ সম্মানিত মাস।
তাৎপর্য ও মহিমা: ইসলামের পঞ্চম রুকন ‘হজ’ এবং হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মারক ‘কোরবানি’ ও ‘ঈদুল আজহা’ এই মাসেই অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম দশ দিনের মর্যাদা: জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন ইবাদতের জন্য বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। বিশেষ করে আরাফাতের দিনের রোজা ও নফল ইবাদতের মর্যাদা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

পবিত্রতা অর্জন মুমিনের জীবনের এক অনুপম সৌন্দর্য। আত্মাকে স্নিগ্ধ রাখা এবং প্রভুর দরবারে সিজদানত হওয়ার প্রাথমিক চাবিকাঠি হলো অজু। কেবল নামাজ বা কোরআন তিলাওয়াতই নয়, সার্বক্ষণিক অজু অবস্থায় থাকার আত্মিক ও মানসিক ফজিলত অপরিসীম।
৮ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
১২ ঘণ্টা আগে
নফল ইবাদত বান্দার আমলনামার সৌন্দর্য। নফল ইবাদতের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে আল্লাহ তাআলার অনেক কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়া যায় অনেক সহজে। মুমিন যখন ফরজ ও সুন্নতে মুআক্কাদা পালন শেষে নফল ইবাদতে নিজেকে আত্মনিয়োগ করে—প্রতিটি রুকু-সেজদা এবং তাসবিহের বিনিময়ে তার মর্যাদা বাড়তে থাকে।
১ দিন আগে
ইবাদত ও আমলকে গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রধান ও বহুল চর্চিত পরিভাষা হলো ‘ফরজ’ ও ‘নফল’। ফরজ, ওয়াজিব কিংবা সুন্নতের মতো পরিভাষাগুলো সরাসরি আল্লাহ তাআলা বা তাঁর রাসুল (সা.) নির্ধারণ করে দিয়ে যাননি।
১ দিন আগে