Ajker Patrika

৬০ বছর আর্কাইভে বন্দী ছিল শায়খ মিনশাবির যে তিলাওয়াত

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
৬০ বছর আর্কাইভে বন্দী ছিল শায়খ মিনশাবির যে তিলাওয়াত

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের কথা। সে সময় মিসরের বিখ্যাত ‘কোরআনুল কারিম’ রেডিওর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মুরাত্তাল’ (মাঝারি বা ধীরগতির) খতম রেকর্ড করেন শায়খ কারি মুহাম্মদ সিদ্দিক মিনশাবি। রেডিওর উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি সেই খতমটি শোনামাত্রই চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় এবং এমন অভূতপূর্ব তিলাওয়াতের ভূয়সী প্রশংসা করে। কিন্তু খোদ মিনশাবি নিজে নিজের কাজে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না।

আল্লাহর কালামের প্রতি গভীর মহব্বত থেকে তিনি রেকর্ডিংগুলো বারবার মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তাঁর মনে হয়, তিলাওয়াতের কিছু অংশের মান তাঁর প্রত্যাশানুযায়ী নিখুঁত হয়নি। ফলে তিনি রেডিও কর্তৃপক্ষের কাছে সেই অংশগুলো পুনরায় রেকর্ড করার আনুষ্ঠানিক আবেদন জানান। শুধু তা-ই নয়, এই পুনরায় রেকর্ডিংয়ের যাবতীয় ব্যয়ভার তিনি নিজের পকেট থেকে বহন করেন। পূর্ণাঙ্গ খতমের মোট ৮২টি রেকর্ডিংয়ের মধ্যে ৩২টি অংশ তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নতুন করে রেকর্ড করেন। অবশেষে ১৯৬৭ সালে এই সংশোধিত সংস্করণটি চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করে।

আসল রহস্যের শুরু এখানেই। নতুন ও পরিমার্জিত সংস্করণটি অনুমোদিত হওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মেই তা রেডিওতে সম্প্রচার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে বাস্তবে তা ঘটেনি। সংশোধিত সেই খতমটি রেডিওর অন্ধকার আর্কাইভে ফাইলবন্দী হয়ে থেকে যায়। মাঝখান থেকে পেরিয়ে যায় দীর্ঘ ছয়টি দশক। ১৯৬৯ সালে এই মহান কারির ইন্তেকালের পরও তাঁর এই অনন্য সাধনা আর আলোর মুখ দেখেনি।

দীর্ঘ ৬০ বছর পর সম্প্রতি যখন রেডিওতে সেই রেকর্ডিং হঠাৎ বাজতে শুরু করে, তখন বোদ্ধা মহলে প্রশ্ন জাগে—যে খতম স্বয়ং রেডিও কর্তৃপক্ষ লুফে নিয়েছিল, যার জন্য মিনশাবি নিজের অর্থ ও অতিরিক্ত শ্রম বিলিয়ে দিয়েছিলেন, তা এত বছর কেন আড়ালে পড়ে রইল?

মিসরের সাবেক প্রধান কিরাতবিশেষজ্ঞ শায়খ আহমদ ঈসা মাসরাবি এ প্রসঙ্গে বলেন, মিনশাবি অকারণে পুনরায় রেকর্ডিংয়ের আবেদন করেননি। আল্লাহর কিতাবের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা থেকে তিলাওয়াতকে সর্বোচ্চ নিখুঁত ও পরিশীলিত করাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

শায়খ মাসরাবি আরও জানান, তিনি এই নতুন সংস্করণটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে শুনেছেন এবং সেখানে এমন কিছু স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছেন, যা আগে প্রচারিত খতমগুলোতে তুলনামূলক কম ছিল। তাঁর মতে, নতুন এই রেকর্ডিংগুলোতে কণ্ঠের এক অদ্ভুত কোমলতা, পরিবেশনার অনন্য দৃঢ়তা এবং গভীর আধ্যাত্মিকতার এক বিশেষ সমন্বয় ঘটেছে। দুটি সংস্করণ পাশাপাশি শুনলেই এই আত্মিক পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়।

শায়খ মাসরাবির ভাষ্য অনুযায়ী, যদিও এই রহস্যের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর এখনো মেলেনি, তবে এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে রেডিওর আর্কাইভে হয়তো এখনো এমন অনেক অজানা ইতিহাস ও অমূল্য রত্ন লুকিয়ে আছে, যা প্রকাশ পেলে কোরআন তিলাওয়াতের জগৎকে নতুনভাবে সমৃদ্ধ করবে।

এদিকে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শায়খ মিনশাবির কন্যা ফাদিয়া মিনশাবির নামে প্রচারিত কিছু পোস্টে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে তাঁর পিতার আরও কয়েকটি বিরল খতম ভবিষ্যতে সম্প্রচার করা হতে পারে। যার মধ্যে শুবা, ওয়ারশ ও দুরি রেওয়ায়েতের খতমের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই তথ্যগুলো কোরআনপ্রেমীদের মনে কৌতূহল ও আগ্রহের নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছে।

তবে সমস্ত রহস্য আর আলোচনার কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত যে নামটি অম্লান হয়ে জ্বলজ্বল করছে, তিনি—শায়খ কারি মুহাম্মদ সিদ্দিক মিনশাবি। মিনশাবি যেমন সুমধুর কণ্ঠের জাদুকর ছিলেন; তেমন কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে শুদ্ধতা, নিয়মতান্ত্রিক সৌন্দর্য, নিপুণতা এবং গভীর আধ্যাত্মিকতার এমন এক ঐশ্বরিক সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে খুব কম কারির ভাগ্যেই জুটেছে। তাঁর কণ্ঠের সেই চিরচেনা কান্নাভেজা সুর শ্রোতার হৃদয়কে সরাসরি আল্লাহর দরবারে নিয়ে হাজির করে।

সূত্র: আল জাজিরা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত