Ajker Patrika

আপনার জিজ্ঞাসা

মিরাজের বাহন বোরাক দেখতে কেমন ছিল?

মুফতি শাব্বির আহমদ
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯: ২০
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: পবিত্র হাদিস থেকে জানা যায়, নবীজি (সা.)-এর মিরাজের বাহন ছিল বোরাক। বোরাক দেখতে কেমন ছিল, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে একটি কৌতূহল কাজ করে। তবে বোরাকের একটি ছবি সমাজে প্রচলিত ‘দেখতে ঘোড়ার মতো। পাখা আছে। চেহারা নারী আকৃতির।’ বোরাকের আকৃতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআন বা হাদিসে কি নির্দিষ্ট কোনো বর্ণনা রয়েছে? জানালে উপকৃত হব।

আজিম উদ্দীন, সূত্রাপুর, ঢাকা

উত্তর: মিরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক মহাবিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনা। মিরাজের সফরটি ছিল কয়েকটি ধাপে বিভক্ত এবং বিভিন্ন স্তরে মহানবী (সা.) বিভিন্ন বাহন ব্যবহার করেছিলেন। তবে মক্কা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত সফরের মূল বাহন ছিল বোরাক। মিরাজের সফরে মহানবী (সা.)-এর বাহন বোরাক নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের জনশ্রুতি ও ছবি প্রচলিত রয়েছে।

বোরাকের শারীরিক বর্ণনা

নবীজি (সা.)-এর হাদিস ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় বোরাকের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা হলো এটি ছিল গাধার চেয়ে বড় এবং খচ্চরের চেয়ে ছোট একটি দীর্ঘদেহী চতুষ্পদ জন্তু। (সুনানে তিরমিজি: ৩১৩১)। এর গায়ের রং ছিল ধবধবে শুভ্র বা সাদা। এর গতি ছিল অকল্পনীয়। বোরাকের দৃষ্টি যেখানে গিয়ে ঠেকত, তার পায়ের ক্ষুর সেখানে গিয়ে পড়ত। অর্থাৎ এটি চোখের পলকেই দৃষ্টির শেষ সীমানায় পৌঁছে যেত। তাফসিরে তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, বোরাকের দুই ঊরুর ওপর দুটি ডানা ছিল, যা তাকে ক্ষিপ্রগতিতে চলতে সাহায্য করত।

বোরাকের প্রচলিত মানবাকৃতি বা নারী চেহারার রহস্য

আমাদের সমাজে বা পুরোনো কিছু পারস্য চিত্রে বোরাকের চেহারা মানুষের মতো, বিশেষ করে নারী আকৃতিতে দেখানো হয়। বিশুদ্ধ কোনো হাদিসে বোরাকের চেহারা মানুষের মতো বা নারীর মতো হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

ইতিহাসবিদদের মতে, পারস্য বা দূরপ্রাচ্যের কিছু কাল্পনিক চিত্রকলায় বোরাককে মানুষের মুখমণ্ডল দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ধারণা করা হয়, আরবি থেকে ফারসি ভাষায় অনুবাদের সময় ‘সুন্দর মুখমণ্ডল’ কথাটির ভুল ব্যাখ্যার ফলে চিত্রকরেরা একে মানুষের চেহারার রূপ দিয়েছেন, যা পরে ভারতীয় উপমহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে সালাবির একটি দুর্বল (জয়িফ) সূত্রে বোরাকের আকৃতির বর্ণনায় মানুষের চেহারার কথা উল্লেখ থাকলেও অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য আলেম ও মুহাদ্দিসগণ একে গ্রহণ করেননি।

বোরাকের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য

নবীজি (সা.) যখন বোরাকের রেকাবে পা রাখতে যান, তখন এটি কিছুটা চঞ্চলতা প্রকাশ করেছিল। জিবরাইল (আ.) যখন তাকে বললেন, ‘তুমি কি জানো তোমার ওপর আজ কে সওয়ার হচ্ছেন? আল্লাহর কাছে তাঁর চেয়ে প্রিয় কেউ কোনো দিন তোমার ওপর বসেনি’—এই কথা শুনে বোরাক লজ্জায় ও ভয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে পড়েছিল।

বিশিষ্ট তাবেয়ি সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা.)-এর মতে, বোরাক সেই জন্তু, যাতে চড়ে হজরত ইবরাহিম (আ.) সিরিয়া থেকে মক্কায় তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে দেখতে আসতেন।

মিরাজ সফরের ৫ বাহন

আল্লামা মাহমুদ আলুসি (রহ.)-এর মতে, ঊর্ধ্বজগৎ পরিভ্রমণে পাঁচটি মাধ্যম ব্যবহৃত হয়েছিল:

১. বোরাক: মক্কা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত।

২. সিঁড়ি: বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে প্রথম আসমান পর্যন্ত।

৩. ফেরেশতাদের ডানা: প্রথম থেকে সপ্তম আসমান পর্যন্ত।

৪. জিবরাইল (আ.)-এর ডানা: সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত।

৫. রফরফ: সিদরাতুল মুনতাহা থেকে আরশে আজিম পর্যন্ত।

বোরাক মহান আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি, যার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল এর অতিপ্রাকৃত গতি এবং শুভ্রতা। এটি দেখতে মূলত একটি উন্নত চতুষ্পদ প্রাণীর মতোই ছিল, নারী বা মানবী আকৃতির কোনো বর্ণনা নির্ভরযোগ্য ইসলামি দলিলে পাওয়া যায় না।

উত্তর দিয়েছেন: মুফতি শাব্বির আহমদ, ইসলামবিষয়ক গবেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত