Ajker Patrika

বেফাক পরীক্ষা: কওমি মাদ্রাসার বছর শেষের উৎসবমুখর পড়াশোনা

ইসলাম ডেস্ক 
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

গতকাল রাত সাড়ে ১১টায় একটা কাজে নিচে নামলাম। আমার বাসা এখন মাদ্রাসা ভবনের টপ ফ্লোরে। প্রতিটি ক্লাসের ছাত্ররা এমনভাবে পড়ছে, যেভাবে হেফজখানার ছাত্ররা মাগরিবের পরে সবক মুখস্থ করে। আমি খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম।

মাদ্রাসার বার্ষিক পরীক্ষার এক সপ্তাহ বাকি। বেফাকের অধীনে কওমি মাদ্রাসার ৪৯তম কেন্দ্রীয় পরীক্ষা শুরু হবে ১৭ জানুয়ারি। বার্ষিক পরীক্ষার এক মাস থেকে ২০ দিন আগে ক্লাস শেষ করে দেওয়া হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা নিজস্ব রুটিনে পড়াশোনা করে। মাদ্রাসায় এই সময়কে খেয়ার বলা হয়।

প্রতিবছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী বিভিন্ন শ্রেণিতে বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। বেফাকের এই পরীক্ষা নিয়ে সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা কাজ করে। ছাত্ররা প্রাণান্তকর চেষ্টা করে বেফাকের পরীক্ষায় ভালো করতে।

পরীক্ষায় ভালো করার ‘বাতিক’ আমারও ছিল। আসলে আমি যে মাদ্রাসাগুলোতে পড়েছি, সেগুলোতে বেফাকের পরীক্ষার ফলাফলকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতো। মাদ্রাসাগুলোতে বছরজুড়ে ভালো পড়াশোনা হতো, তবে বেফাকের পরীক্ষা সমাগত হলে ছাত্ররা পড়তে পড়তে পাগলপ্রায় হয়ে পড়ত।

তাই গতকাল মধ্যরাতেও আমাদের ছাত্রদের গা দুলিয়ে প্রচণ্ড জোশের সঙ্গে পড়তে দেখে নিজের ছাত্রজীবনের কথা মনে পড়ে গেল।

২০০৯ সালে আমি কিতাব বিভাগে তাইসির জামাতে ভর্তি হয়েছিলাম নেত্রকোনা জেলা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রামের একটা মাদ্রাসায়। মাদ্রাসাটি প্রত্যন্ত গ্রামে হলেও বেফাকে ভালো ফল করার কারণে সারা দেশে এর পরিচিতি আছে। আশরাফুল উলুম সুতারপুর মাদ্রাসা।

মাদ্রাসার শিক্ষকগণ বেফাকের পরীক্ষার্থীদের বিশেষ তদারকি করতেন। তবে সেখানকার পরিবেশ এমন যে বিশেষ তদারকির খুব দরকার ছিল না। রাতে শোবার সময় হলে ছাত্ররা নিজেদের পড়ার রুম ছেড়ে মসজিদে, বারান্দায়, অফিসের সামনে, যেখানে জায়গা পেত জায়নামাজ বিছিয়ে ওভার টাইমে পড়তে বসে যেত। গ্রামে বিদ্যুৎ-সরবরাহ তখন অত ভালো ছিল না। ছাত্ররা নিজস্ব লাইট, মোমবাতি জ্বালিয়েই দীর্ঘ সময় পড়ত।

২০১৫ সালে চলে আসি ঢাকার বাইতুল উলুম ঢালকানগর মাদ্রাসায়। সে সময় ঢালকানগর মাদ্রাসা ছিল বেফাকের সিরিয়ালে সারা দেশে প্রথম স্থানে। মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া ঢালকানগরের ছাত্রদের জন্য অতি সাধারণ ঘটনা। শুধু প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হলে তাদের আলাদা একটু মূল্যায়ন করা হতো।

ঢালকানগরে বেফাকের পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের বাড়তি কোনো তদারকি ছিল না। সারা বছর সাধারণ মানের পড়াশোনা হলেও পরীক্ষার সময় দেখা যেত ছাত্রদের সে কী প্রাণপণ চেষ্টা। রাত ১টা-২টা পর্যন্ত পড়ে অল্প কিছু সময় ঘুমিয়ে ফজরের পর থেকে আবার শুরু হতো রুটিনমাফিক পড়া। আমার এক বন্ধু ছিল আশরাফ। সারা বছর অত সিরিয়াস না হলেও পরীক্ষার কয়েক দিন সে বলতে গেলে একদমই ঘুমাত না। পরীক্ষার সিরিয়ালে একদম শুরুর দিকে থাকত।

বেফাকের মতো এত সুশৃঙ্খলভাবে বাংলাদেশে দ্বিতীয় কোনো পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন হয় না। কিন্তু মূলধারায় এটা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। কাগজের মূল্যায়ন আমাদের শিক্ষার্থীদের নেই। সেটা নিয়ে তাদের খুব একটা আক্ষেপও নেই হয়তো। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীর মেধা ও প্রচেষ্টার মূল্যায়ন করা তো আমাদের রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র সে দায়িত্ব কতটুকু পালন করছে?

লেখক: ওলিউর রহমান, শিক্ষক, মাদ্রাসাতুল মুত্তাকিন, উত্তরা, ঢাকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত