
বাগেরহাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন হজরত খানজাহান আলী (রহ.)। তিনি কেবল একজন পীর বা ধর্মপ্রচারকই ছিলেন না, ছিলেন একাধারে বীর সেনাপতি ও দক্ষ প্রশাসক। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ‘ঠাকুরদীঘি’ এবং এর বিখ্যাত কুমির ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’-এর গল্প শোনেনি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়।
বংশপরম্পরায় প্রায় সাড়ে ছয় শ বছর ধরে চলে আসা সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে সম্প্রতি। কিন্তু কীভাবে এই দিঘিতে কুমিরের আগমন ঘটেছিল এবং কেনই-বা আজ দিঘিটি কুমিরশূন্য? চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
খানই আজম খানজাহান আলী (রহ.) ছিলেন দিল্লি সালতানাতের একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও দূরদর্শী সেনাপতি। অসামান্য কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণে তরুণ বয়সেই তিনি প্রধান সেনাপতির পদে উন্নীত হন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে দিল্লির সুলতান তাঁকে জৈনপুরের গভর্নর বানিয়ে তাঁর যোগ্যতার মূল্যায়ন করেন।
পরবর্তীকালে বাংলায় যখন অত্যাচারী রাজা গণেশের শাসন চলছিল, তখন তাঁকে দমন করার গুরুদায়িত্ব আসে খানজাহান আলীর কাঁধে। সুলতানের পাঠানো দুই লাখ সেনার বিশাল বহর এবং নিজের ৬০ হাজার প্রশিক্ষিত বাহিনী নিয়ে তিনি বাংলা আক্রমণ করেন। যুদ্ধে গণেশ পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়।
এরপর সুলতানের আদেশে ইসলাম প্রচার ও রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি দক্ষিণ-বঙ্গে (বর্তমান বাগেরহাট, খুলনা ও যশোর অঞ্চল) আগমন করেন। সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে তিনি সেখানে মুসলিম বসতি গড়ে তোলেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন ‘খলিফাতাবাদ’ নামক এক সমৃদ্ধ নগর রাষ্ট্র।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, যশোরের ঝিনাইদহের বারোবাজার থেকে শুরু করে সমগ্র ভাটি অঞ্চলজুড়ে তিনি ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ করেন। পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষের মিষ্টি পানির তীব্র সংকট দূর করতে তিনি সমসংখ্যক অর্থাৎ ৩৬০টি দিঘি খনন করান। এর মধ্যে সবচেয়ে বিশাল ও বিখ্যাত দিঘিটি হলো তাঁর মাজারসংলগ্ন ‘ঠাকুরদীঘি’। প্রায় ২০০ বিঘা জমির ওপর এই দিঘি খনন করা হয়েছিল।
দিঘির পানি পরিষ্কার ও এর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য খানজাহান আলী (রহ.) সেখানে দুটি মিষ্টি পানির কুমির ছাড়েন। পরম যত্নে লালিত এই পুরুষ কুমিরটির নাম রাখা হয়েছিল ‘কালাপাহাড়’ এবং স্ত্রী কুমিরটির নাম ‘ধলাপাহাড়’। কুমির দুটির সঙ্গে এই সুফি সাধকের ছিল এক অলৌকিক সখ্য। মাজারের খাদেমদের মতে, নাম ধরে ডাক দিলেই তারা দিঘির ঘাটে চলে আসত।
খানজাহান আলী (রহ.)-এর মৃত্যুর পর দিঘির পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধার অংশ হিসেবে কালক্রমে মানুষ তাঁর পালিত কুমির দুটিকেও সমীহ করতে শুরু করে। তবে সময়ের আবর্তে এর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা কুসংস্কার। রোগবালাই থেকে মুক্তি পেতে কুমিরের নামে ছাগল-মুরগি মানত করা, দিঘির পানিতে গোসল করা কিংবা কুমিরকে স্পর্শ করার মতো প্রথা চালু হয়ে যায় সাধারণ দর্শনার্থীদের মাঝে।
প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত হিংস্র স্বভাবের হলেও, এই দিঘির কুমিরগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাজারের ভক্ত বা দর্শনার্থীদের কোনো ক্ষতি করেনি। মাজারের খাদেমরা ঘাট থেকে ‘কালাপাহাড়’ বা ‘ধলাপাহাড়’ বলে হাঁক দিলেই কুমিরগুলো শান্ত ভঙ্গিতে ঘাটে এসে মানুষের দেওয়া হাঁস-মুরগি খাবার হিসেবে গ্রহণ করত। এভাবেই বংশপরম্পরায় প্রায় সাড়ে ছয় শ বছর ধরে তারা এই দিঘিতে বসবাস করে আসছিল।
তবে নানাবিধ প্রতিকূলতায় ২০১৫ সালের দিকে এই আদি বংশের সর্বশেষ কুমিরটি মারা যায়। এর আগে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ২০০৪ সালের দিকে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে এই দিঘিতে ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু জলবায়ু ও পরিবেশগত কারণে তাদের কয়েকটি মারা যায়। সর্বশেষ টিকে থাকা দুটি কুমিরের একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা গেলে দিঘিতে কেবল একটি কুমিরই অবশিষ্ট ছিল।
দীর্ঘ সাড়ে ছয় শ বছরের শান্ত ইতিহাসের গায়ে আচমকা দাগ লাগে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে ৮টা। দিঘির ঘাটে তখনো দর্শনার্থীদের বেশ সমাগম ছিল। এমন সময় নারীদের জন্য নির্ধারিত ঘাটে গোসল করতে নামে আট বছর বয়সী এক শিশু, ফাতেমা। পানির নিচে ওত পেতে থাকা নিঃসঙ্গ ও হিংস্র হয়ে ওঠা শেষ কুমিরটি হঠাৎ ফাতেমার ওপর আক্রমণ করে এবং গভীর পানিতে টেনে নিয়ে যায়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারীরা দ্রুত অভিযান শুরু করেন। দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার অক্লান্ত প্রচেষ্টার পর পরদিন সকালে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়। জনাকীর্ণ লোকালয় ও দর্শনার্থীদের পবিত্র তীর্থস্থানে এমন হিংস্র প্রাণী রাখার বিষয়ে সাধারণ মানুষ ঘোর আপত্তি জানায়। নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন ও বন্য প্রাণী বিভাগ।
অবশেষে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৩ জুন, ২০২৬ দিঘির সর্বশেষ কুমিরটিকে খাঁচাবন্দী করে সুন্দরবনে স্থানান্তর করা হয়। আর এর মধ্য দিয়েই প্রায় সাড়ে ছয় শ বছরের প্রাচীন ইতিহাসের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ কুমিরমুক্ত হলো ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.)-এর দিঘি।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া; যশোহ-খুলনার ইতিহাস (সতীশচন্দ্র মিত্র)
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া আল ইহসান

‘দোয়া’ শব্দটি মূলত আরবি ‘দাআ’ ধাতু থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। যার অর্থ—সম্বোধন করা, কাউকে ডাক দেওয়া, আহ্বান করা, প্রার্থনা বা অনুরোধ করা। সহজ কথায়, মহান আল্লাহ তাআলাকে পরম আকুতিতে সম্বোধন করে ডাকা এবং তাঁর কাছে নিজের অভাব-অভিযোগ ও প্রয়োজন পেশ করাই হচ্ছে মূলত দোয়া।
২ ঘণ্টা আগে
তাহিয়্যাতুল মসজিদ বা দুখুলুল মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল নামাজ। তাহিয়্যা অর্থ উপহার এবং দুখুল অর্থ প্রবেশ করা। মসজিদে প্রবেশ করেই উপহার হিসেবে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা হয় বলে এর নাম তাহিয়্যাতুল মসজিদ অথবা দুখুলুল মসজিদ।
১৪ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
১৮ ঘণ্টা আগে
মানুষের জীবনে সুস্থতা ও অসুস্থতা উভয়ই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। বিভিন্ন সময়ে আমরা প্রাণঘাতী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হই। এসব কঠিন রোগ ও ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচতে চিকিৎসার পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্যের বিকল্প নেই। তিনিই মানুষকে রোগ থেকে আরোগ্য ও মুক্তি দিতে পারেন।
২ দিন আগে