তৎকালীন আরব সমাজ যখন ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন ছিল, মজলুমের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছিল আকাশ-বাতাস, আর মানবসভ্যতা বঞ্চনার হিমালয়ের নিচে ডুকরে কাঁদছিল—ঠিক তখনই ন্যায়বিচারের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে আগমন করেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। মানুষের অধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মূলত দুনিয়ায় ইনসাফ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে কিতাব ও রাসুলদের পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচারের কিতাব এবং তা কার্যকর করার দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় সব রাসুল প্রেরণ করেছি।’ (সুরা হাদিদ: ২৫)
ইসলামে প্রতিটি কাজকর্মে ন্যায়পরায়ণতার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এই ন্যায়পরায়ণতা কেবল নিজেদের অনুসারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা অমুসলিম, ধনী-দরিদ্র, শক্তিশালী-দুর্বলনির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
ইসলামি বিধানমতে, সমাজে ন্যায়বিচারের ধারা অব্যাহত রাখা ‘ফরজে কিফায়া’। অর্থাৎ, সমাজের একটি অংশ যদি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকে, তবে অন্যরা দায়মুক্ত হয়ে যাবে; অন্যথায় সবাইকে ফরজ ত্যাগের দায় নিতে হবে। সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্র ও শাসকের প্রধান দায়িত্বের একটি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক তার অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সে জনগণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮)
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম বড় বাধা হলো স্বজনপ্রীতি ও আভিজাত্যের অহংকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) সমাজ থেকে উঁচু-নিচুর বৈষম্য এবং বিচার বিভাগের স্বজনপ্রীতি কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন।
একবার বনু মাখজুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়লে কিছু সাহাবি তাঁর বংশমর্যাদার কথা বিবেচনা করে শাস্তি লঘু করার সুপারিশ করতে চাইলেন। এতে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত হন এবং এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন—‘তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংসের কারণ এই ছিল যে তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো, আর দুর্বল কেউ চুরি করলে তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করা হতো...আল্লাহর কসম! যদি আমার মেয়ে ফাতেমাও চুরি করত, তবু আমি তার হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি: ৪৩০৪/৬৭৮৭)
ইসলামি আইনগ্রন্থ ‘ফতোয়ায়ে শামি’তে ইসলামের দৃষ্টিতে একজন আদর্শ বিচারকের বেশ কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ও আচরণবিধি উল্লেখ করা হয়েছে, যা আধুনিক বিচারব্যবস্থার জন্য এক যুগান্তকারী পথনির্দেশক:
ক. উন্মুক্ত আদালত: বিচারক যেখানেই বিচারকার্য পরিচালনা করুন না কেন, সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশের অবাধ অনুমতি থাকতে হবে। বিচারপ্রার্থী যেন সহজে বিচারকের কাছে পৌঁছাতে পারেন।
খ. উপহার ও দাওয়াত বর্জন: বিচারক বিচার চলাকালীন কারও কাছ থেকে কোনো উপহার নিতে পারবেন না এবং বিশেষ কোনো দাওয়াতে অংশ নিতে পারবেন না।
গ. উভয় পক্ষের প্রতি সমতা: মামলার বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো এক পক্ষের সঙ্গে গোপন আলাপ করা, উচ্চ স্বরে কথা বলা, হাসাহাসি করা বা তাদের সম্মানার্থে দাঁড়ানো থেকে বিচারককে বিরত থাকতে হবে।
ঘ. গম্ভীর পরিবেশ বজায় রাখা: বিচারের মঞ্চে বসে ঠাট্টা-মশকরা করা যাবে না এবং এমন কোনো ভাষায় কথা বলা যাবে না, যা অপর পক্ষ বুঝতে অপারগ।
হাদিসে রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, শাসক বা বিচারক যদি অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের তাঁর কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে রাখেন, তবে আল্লাহও তাঁর প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করে রাখবেন।
ন্যায়পরায়ণ বিচারকদের ইসলামে অভূতপূর্ব মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়নিষ্ঠদের ভালোবাসেন।’ (সুরা মায়িদা: ৪২)
বিচারকাজ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় আল্লাহর রাসুল (সা.) সাবধান করে বলেছেন, ‘যাকে মানুষের মধ্যে বিচারক বানানো হলো, তাকে যেন ছুরি ছাড়া জবাই করা হলো।’ (তুহফাতুল আহওয়াজি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিচারকদের ভবিষ্যৎ উল্লেখ করে বলেন, বিচারকেরা তিন ভাগে বিভক্ত—একদল জান্নাতি এবং দুই দল জাহান্নামি: ১. জান্নাতি: যে বিচারক সত্য জানে এবং সেই অনুযায়ী ফয়সালা করে। ২. জাহান্নামি: যে ব্যক্তি সত্য জানা সত্ত্বেও রায়ে অন্যায়ের আশ্রয় নেয়। ৩. জাহান্নামি: যে ব্যক্তি সত্য না জেনে সম্পূর্ণ অজ্ঞ অবস্থায় বিচারকাজ সম্পাদন করে।
বর্তমান বিশ্বে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আইনের সুশাসনের অভাবে যে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় ইসলামের এই ইনসাফপূর্ণ বিচারনীতিমালার বাস্তবায়ন। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেখানো সুষম আদর্শ এবং তাকওয়াভিত্তিক বিচারকাঠামো অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল একটি চিরশান্তিময়, বৈষম্যহীন ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।

যারা আগেভাগে মসজিদে আসে এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনে—তাদের জন্য রয়েছে অতুলনীয় সওয়াবের প্রতিশ্রুতি। এমনকি কারও নামের পাশে লেখা হতে পারে উট সদকার সওয়াবও! হাদিস ও কোরআনের আলোকে আমরা জেনে নিতে পারি—এই দিনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং তা কীভাবে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়।
২০ মিনিট আগে
একটি সংসারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন দুজন মানুষ—স্বামী ও স্ত্রী। একই ছাদের নিচে আলাদা চিন্তা ও অভ্যাসের দুজন মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহনশীলতার মাধ্যমে গড়ে তোলেন একটি নতুন জীবন। সুখী সংসার এক দিনে গড়ে ওঠে না; তা সময়ের পরতে পরতে নির্মিত হয়। সংসারের এই হাসি ইহকাল পেরিয়ে...
২ ঘণ্টা আগে
ঘুমন্ত অবস্থায় চিন্তা ও কল্পনার ওপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সে ইচ্ছা করলেও কোনো নির্দিষ্ট স্বপ্ন দেখতে পারে না, আবার অপছন্দের স্বপ্নও ঠেকাতে পারে না। এ কারণেই ইসলাম স্বপ্নকে মানুষের ইচ্ছাকৃত কর্মের অন্তর্ভুক্ত করেনি।
২ ঘণ্টা আগে
স্পেন এমন বহু মুসলিম মনীষীর উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে, যাঁরা বিশ্বসভ্যতার মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। হরেক রকমের জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখায় এই মনীষীদের অনন্য অবদানের ফলেই আন্দালুস (মুসলিম স্পেন) তার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় ও জাঁকজমকপূর্ণ সময় পার করেছে।
২ ঘণ্টা আগে