Ajker Patrika

ঐতিহাসিক মসজিদুল ফাসহের অজানা ইতিহাস

কাউসার লাবীব
ঐতিহাসিক মসজিদুল ফাসহের অজানা ইতিহাস

মসজিদুল ফাসহ উহুদ যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি পবিত্র স্থাপনা। এটি উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে, রণক্ষেত্রের উত্তর দিকে ৭০০-৮০০ মিটার দূরে অবস্থিত। ঐতিহাসিক কৌশল হিসেবে প্রিয় নবী মুসলিম বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছিলেন, যেন তাদের মুখ থাকে মদিনার দিকে আর পিঠ থাকে উহুদ পাহাড়ের টিলাগুলোর দিকে। ফলে শত্রুরা মুসলিম বাহিনী ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নেয়।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রথম উল্লেখ

মদিনার ইতিহাসের অন্যতম আকর গ্রন্থ ‘তারিখুল মাদিনাতিল মুনাওয়ারাহ’-তে ওমর বিন শিব্বাহ আল-বাসরি (মৃত্যু: ৮৭৬ খ্রি.) প্রথম এই মসজিদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, নবীজি (সা.) উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি ছোট মসজিদে নামাজ আদায় করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এটিই মসজিদুল ফাসহ। মসজিদে নববি ও কুবা মসজিদের পর এটিই প্রথম সারির সেই মসজিদগুলোর একটি, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ আদায় করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত।

নির্মাণশৈলী ও উমাইয়া যুগ

ধারণা করা হয়, মদিনার উমাইয়া গভর্নর ওমর বিন আবদুল আজিজ এই মসজিদ প্রথম নির্মাণ করেন। খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের নির্দেশে মসজিদে নববির ঐতিহাসিক সম্প্রসারণের পর, গভর্নর ওমর বিন আবদুল আজিজ মদিনার প্রাচীন ও পবিত্র স্থানগুলোতে সুনির্দিষ্ট স্থাপত্যশৈলী দিয়ে ছোট ছোট মসজিদ নির্মাণ করে দেন, যাতে মানুষ সেগুলো সহজে জিয়ারত করতে পারে। মদিনার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কালো লাভা পাথর দিয়ে তৈরি এই মসজিদ ছিল আয়তাকার; দৈর্ঘ্যে ৬ মিটার ও প্রস্থে ৪ মিটার।

ভুল ধারণা ও লোককথা

একসময় মসজিদসংলগ্ন পাহাড়ের গায়ে মানুষের মাথার আকৃতির একটি গর্ত ছিল। এটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচলিত ছিল যে যুদ্ধের পর নবীজি (সা.) সেখানে হেলান দিয়ে বসে বিশ্রাম নিয়েছিলেন এবং তাঁর ক্ষত ধৌত করা হয়েছিল। আবার উত্তরের একটি গুহা সম্পর্কেও এমন ধারণা প্রচলিত ছিল। তবে জামালউদ্দিন আল-মাতারি এবং সামহুদির মতো প্রখ্যাত ঐতিহাসিকেরা একে স্রেফ ‘লোককথা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, অজ্ঞতা ও দুর্বল বিশ্বাসের কারণে মানুষ এসব বিষয় কল্পনা করে নিয়েছে।

স্থাপত্যের বর্তমান অবস্থা

শতাব্দীর পর শতাব্দী অবহেলায় মসজিদটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। উসমানীয় যুগে এটি একবার সংস্কার করা হলেও পরবর্তী সময়ে আবারও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। বর্তমানে এর শুধু ভিত্তি এবং দক্ষিণ দিকের কিবলা দেয়ালটি প্রায় দুই মিটার উচ্চতায় টিকে আছে। কিবলা দেয়ালটি এতই পুরু যে এর মিহরাবটি দেয়ালের ভেতরেই খোদাই করা।

নামকরণ ও একটি ভুল শব্দের সংশোধনী

আরবি ‘ফাসহ’ শব্দের অর্থ হলো পথ প্রশস্ত করা বা স্থান দেওয়া। অনেকে মনে করেন, সুরা মুজাদিলার ১১ নম্বর আয়াত (যেখানে মজলিশে একে অপরকে জায়গা করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে) এই স্থানে অবতীর্ণ হয়েছিল। তবে নির্ভরযোগ্য কোনো মুফাসসির বা ঐতিহাসিক এই মত গ্রহণ করেননি।

পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা

বর্তমানে আল মদিনা রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট অথরিটির অধীনে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মসজিদের অবশিষ্টাংশ রক্ষা, চারপাশে কাঠের ছাউনি তৈরি এবং মেঝে সংস্কারের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য এটিকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: ইসলামি সিটি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত