যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে, জয়ের আশা ডেমোক্র্যাটদের
• আজ রাতের মধ্যে ভোটের ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
• প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে ও সিনেটের ৩৫টিতে ভোট।
• অধিকাংশ জনমত জরিপে এগিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি জনগণের মনোভাব প্রকাশের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। আজ রাতের মধ্যে ভোটের ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন সময়ে এই ভোট গ্রহণ শুরু হলো যখন জনমত জড়িপ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। তবে ভোটের দিনই চমক দেখালেন ট্রাম্প। গতকাল যখন ভোট গ্রহণ শুরু হয় তখনই ইসরায়েলের ১০ বছর মেয়াদী নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার লাগাম টেনে আইনসভা কংগ্রেসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশায় আছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।
প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে প্রেসিডেন্টের আইন প্রণয়ন আটকে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত শুরু করার সুযোগও তৈরি হবে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়বে।
নির্বাচনের ফল রিপাবলিকানদের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কেবল দুটো মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। বাকি প্রায় সব নির্বাচনেই আসন হারিয়েছে ক্ষমতাসীন দল।
এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫ টিতে নির্বাচন হচ্ছে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র তিনটি আসন বাড়াতে হবে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তাদের নিট চারটি আসন বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ৩৬টি গভর্নর পদে নির্বাচন হচ্ছে। অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে আইনসভাগুলোর হাজার হাজার আসনেও ভোট হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভোটারদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ধনকুবের ওপর কর আরোপ এবং গর্ভপাতের অধিকারসংক্রান্ত বিষয়।
জরিপে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের দুর্বল অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
দেশজুড়ে পরিচালিত একটি জরিপে রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে রেখেছেন ভোটাররা। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ শতাংশ, আর রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৮ শতাংশ।
এবারের নির্বাচনে নিজে প্রার্থী না হলেও ট্রাম্পকে ঘিরেই হচ্ছে ভোটের লড়াই। দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, শুল্কনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বেড়ে যাওয়া জ্বালানির দাম মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করেছে। সিএনএনের ‘পোল অব পোলস’ অনুযায়ী, ট্রাম্পের গড় জনসমর্থন এখন ৩৪ শতাংশ।
অক্টোবরে সিএনএনের একটি জনমত জরিপে তাঁর প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৩২ শতাংশে। একই জরিপে ৭৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তোষ জানিয়েছেন। অন্য একটি জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৩২ শতাংশ উত্তরদাতা। দুই সপ্তাহ আগে তাঁর সমর্থন ৩১ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, যা ছিল রেকর্ড সর্বনিম্ন।
নিজের ঢোল পেটানো
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন বক্তব্যে নিজের প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়ে ট্রাম্প বলেন, অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করেছেন তিনি। ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান রাখতে হবে। এখন আমরা মহান। দুই বছর আগে আমাদের অবস্থা ছিল ভয়াবহ।’
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্বে আমাদের নিয়ে হাসাহাসি হতো। অন্য দেশের নেতারা আমাদের গুরুত্বই দিতেন না। তাঁরা আমাদের বোকা মনে করতেন। এখন আমরা আলোচনায়। বিশ্বের সবাই আমাদের সম্মান করে। আমরা এই অবস্থান ধরে রাখব এবং আরও ভালো করব।’
ইসরায়েলকে নিরাপত্তা সহায়তা বন্ধের ঘোষণা
ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বার্তাসংস্থা এএফপির খবরে জানা যায়, ট্রাম্প বলেন, এই সহায়তা বন্ধে ইসরায়েলের আপত্তি নেই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা করেই সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০১৯ সালে কার্যকর হওয়া সহায়তা চুক্তিটি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায় ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলকে বছরে ৩৮০ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইসরায়েল আমাদের এক নম্বর মিত্র। অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আমরা তাদের বেশি সহায়তা দিই। এখন তাদের আর সেই সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে তাদের প্রয়োজন হলে আমি সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষেই বলতাম। ইসরায়েলের প্রয়োজন হলে আমরা তাদের সহায়তা করব।’
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক খাতে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর এই হিসাব করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোনো দেশকে এত বেশি সহায়তা দেয়নি।









