ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ১০ বিলিয়ন ডলারের মানহানি মামলা স্থায়ীভাবে খারিজ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা ১০ বিলিয়ন ডলারের মানহানি মামলা স্থায়ীভাবে খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির এক ফেডারেল আদালত। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এর মালিক রুপার্ট মারডক এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি খারিজ করে গতকাল শনিবার এ আদেশ দেন জেলা আদালতের বিচারক ড্যারিন গেইলস।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মানহানির মামলা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় ‘প্রকৃত বিদ্বেষ’ (অ্যাকচুয়াল ম্যালিস) প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, এ ধরনের মামলা সফল করতে বাদীকে প্রমাণ করতে হয়, বিবাদী বক্তব্যটি মিথ্যা জেনেও প্রকাশ করেছেন অথবা এর সত্যতা যাচাইয়ে বেপরোয়া অবহেলা করেছেন।
বিচারক গেইলস তাঁর আদেশে বলেন, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে ১০ বিলিয়ন ডলারের মামলা করে ট্রাম্প ‘খড়কুটো আঁকড়ে ধরার’ চেষ্টা করছেন। তিনি আরও বলেন, সংশোধিত অভিযোগপত্রেও প্রকৃত বিদ্বেষের অভিযোগ প্রতিষ্ঠার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। অভিযোগগুলো অস্পষ্ট, উপসংহারনির্ভর এবং কিছু ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমটির প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। অনেক অভিযোগের সঙ্গে সাংবাদিকেরা প্রতিবেদনটিকে মিথ্যা বলে জানতেন কি না, সেই প্রশ্নেরও সরাসরি সম্পর্ক নেই।
বিচারক আরও ইঙ্গিত দেন, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তদন্তপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল, এমন ধারণা তৈরির চেষ্টা করেছে ট্রাম্পের আইনজীবী দল। জেফরি অ্যাপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের যোগসূত্র তুলে ধরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০০৩ সালে অ্যাপস্টেইনের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছাবার্তার একটি সংকলনে ট্রাম্পের নামে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ একটি বার্তা ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের কুখ্যাত সমাজকর্মী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল শুভেচ্ছাবার্তাগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। অ্যাপস্টেইনের যৌন পাচারচক্রে জড়িত থাকার দায়ে বর্তমানে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন তিনি।
ট্রাম্পের নামে থাকা বার্তাটিতে টাইপ করা লেখা এবং হাতে আঁকা একজন সুঠাম দেহের নারীর অবয়ব ছিল। ছবিটির নিচের অংশে, নারীর শ্রোণি অঞ্চলের স্থানে ট্রাম্পের স্বাক্ষর ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই লেখা, স্বাক্ষর ও ছবি আঁকার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা থাকার কথা জোরালোভাবে অস্বীকার করেন ট্রাম্প। পরে প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি কমিটির মাধ্যমে চিঠিটির একটি অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় অ্যাপস্টেইনের যৌন অপরাধসংক্রান্ত নথি প্রকাশ না করা নিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন সমালোচনার মুখে ছিল। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ নথি গোপন রেখেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে অ্যাপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ধরন নিয়েও সমালোচনা চলছিল।
ট্রাম্প ও অ্যাপস্টেইনকে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা গেছে। রাজনীতি, শিক্ষাঙ্গন ও ব্যবসায়িক জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন অ্যাপস্টেইন। ২০২৫ সালে ট্রাম্প দাবি করেন, অ্যাপস্টেইনে তাঁর মার-আ-লাগো অবকাশকেন্দ্র থেকে নারী কর্মীদের ‘চুরি’ করার পর তিনি তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
অ্যাপস্টেইন ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে অর্থ দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। এ ঘটনায় তাঁকে ১৩ মাস কারাভোগ করতে হয়। ২০১৯ সালে যৌন পাচারসংক্রান্ত অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মামলা করা হলেও বিচার শুরুর আগেই নিউইয়র্কের কারাগারে নিজের কক্ষে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়। আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের ধারণা, অ্যাপস্টেইনের যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তির সংখ্যা কয়েক শ।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প সেটিকে ‘মিথ্যা, বিদ্বেষপূর্ণ ও মানহানিকর’ বলে আখ্যা দেন। ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই মিয়ামির ফেডারেল আদালতে করা মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, সংবাদমাধ্যমটি ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকেরা ‘জেনেশুনে এবং বেপরোয়াভাবে’ অসংখ্য মিথ্যা, মানহানিকর ও অবমাননাকর বক্তব্য প্রকাশ করেছেন। মামলায় দাবি করা হয়, ওই প্রতিবেদনের কারণে ট্রাম্পের আর্থিক ও সুনামগত ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই সাংবাদিককেও মামলায় আসামি করা হয়েছিল।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে বিচারক গেইলস মামলাটি খারিজ করে বলেছিলেন, প্রতিবেদনটি প্রকৃত বিদ্বেষ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, এমন অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প। তবে তখন সংশোধিত অভিযোগপত্র দাখিল করে নতুন করে মামলা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। মে মাসে ট্রাম্প সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংশোধিত মামলা করেন।
নতুন অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, সাংবাদিকেরা কীভাবে জন্মদিনের চিঠিটি পেয়েছিলেন এবং এর সত্যতা কীভাবে যাচাই করেছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করে সংবাদমাধ্যমটি বেপরোয়া আচরণ করেছে। তবে আদালত সেই যুক্তিও গ্রহণ করেননি।
শনিবারের আদেশে মামলাটি ‘উইথ প্রেজুডিস’ বা চূড়ান্তভাবে খারিজ করা হয়েছে। ফলে একই অভিযোগে ভবিষ্যতে নতুন করে মামলা করার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেল।
এদিকে, অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেও ট্রাম্পের একাধিক মানহানির মামলা চলমান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিবিসি ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস রয়েছে।








