Ajker Patrika

অমীমাংসিত মেলিসা হত্যাকাণ্ডের ৪০ বছর পর ফোন করে নিজের পরিচয় দিলেন খুনি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ২২: ০৬
অমীমাংসিত মেলিসা হত্যাকাণ্ডের ৪০ বছর পর ফোন করে নিজের পরিচয় দিলেন খুনি
১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর নিজের শোবার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় মেলিসাকে। ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম

প্রায় ৪০ বছর ধরে একটি হত্যাকাণ্ড ঘিরে ছিল অমীমাংসিত রহস্য। ১৯৮৭ সালের সেই রাতে ২০ বছর বয়সী মেলিসা ‘মিসি’ টেলর এলিসনকে নিজের শোবার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পাশের ঘরে তখন কাঁদছিল তাঁর মাত্র ১৩ মাসের শিশুকন্যা ক্যাসি। দীর্ঘ ৩৮ বছর পর অবশেষে সেই হত্যারহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। ৭০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি পুলিশের কাছে ফোন করে মেলিসার হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সিএনএন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলে ১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঘটে ওই ঘটনাটি। মেলিসার দুই রুমমেট তাঁকে শোয়ার ঘরে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, মাথায় ভোঁতা কোনো বস্তু দিয়ে আঘাতের কারণেই মেলিসার মৃত্যু হয়েছে এবং এটি একটি হত্যাকাণ্ড।

কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডে কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বছরের পর বছর তদন্ত চললেও মেলিসার পরিবার জানতে পারেনি কে তাঁকে হত্যা করেছিল।

অবশেষে চলতি বছরের ৮ জুলাই ক্লে কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ে ফোন করেন গ্যারি গ্লোওয়াচ নামে ৭০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। ফ্লোরিডার মিডলবার্গের বাসিন্দা গ্লোওয়াচ পুলিশকে জানান, তিনি একটি পুরোনো হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ‘সবকিছু পরিষ্কার করতে’ চান। পরে জ্যাকসনভিল শেরিফের কার্যালয়ের কোল্ড কেস ইউনিটের গোয়েন্দাদের কাছে তিনি জানান, ১৯৮৭ সালে অর্থের সন্ধানে একটি বাড়িতে ঢুকে মেলিসাকে তিনি কাঠের গুঁড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করেছিলেন।

পুলিশের গ্রেপ্তারি প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, বহু বছর আগের সেই সময়টিতে গ্লোওয়াচ মাদক কেনার জন্য টাকা বা বিক্রি করা যায়—এমন জিনিস খুঁজছিলেন। মেলিসার বাড়ি থেকে তাঁর বাসস্থান ছিল মাত্র আধা মাইল দূরে। হত্যার দিনই পৃথক একটি চুরির অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।

মেলিসার ১৩ মাস বয়সী কন্যা ক্যাসি এখন চল্লিশোর্ধ্ব নারী। ছবি: সিএনএন
মেলিসার ১৩ মাস বয়সী কন্যা ক্যাসি এখন চল্লিশোর্ধ্ব নারী। ছবি: সিএনএন

গ্লোওয়াচের ভাষ্য অনুযায়ী—তিনি জানালা দিয়ে মেলিসার বাড়িতে ঢুকে তাঁর শোয়ার ঘরে যান। সেখানে বিছানায় মেলিসাকে তাঁর শিশুকন্যা ক্যাসিকে পাশে নিয়ে শুয়ে থাকতে দেখেন। এ সময় ঘরেই পাওয়া একটি কাঠের গুঁড়ি দিয়ে মেলিসার ঘাড়ের কাছে মাথায় একবার আঘাত করেন তিনি। এরপর শিশুটিকে কোলে তুলে বসার ঘরের সোফায় রেখে আবার শোয়ার ঘরে ফিরে যান এবং মেলিসার গদির নিচে টাকা খুঁজতে থাকেন।

তদন্তকারীরা জানান, গ্লোওয়াচ হত্যাস্থলের এমন কিছু বিবরণ দিয়েছেন, যা আগে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি এবং চলতি বছরের শুরুতে তিনি যে প্রতিবেদনটি পড়েছিলেন, সেখানেও এসব তথ্য ছিল না। ফলে তাঁর স্বীকারোক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা আরও জোরালো হয়।

গ্লোওয়াচ জানান, চলতি বছরের মার্চে মেলিসার হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি প্রতিবেদন পড়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, ওই মৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী। তাঁর দাবি, আঘাতের পর মেলিসা মারা গেছেন—এটি তিনি জানতেন না।

মেলিসার হত্যার ঘটনায় গ্লোওয়াচের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়-ডিগ্রি হত্যা এবং হামলা বা ব্যাটারিসহ সশস্ত্র চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ডুভাল কাউন্টি জেলে জামিন ছাড়াই আটক আছেন।

এই স্বীকারোক্তির খবর প্রথমে পান মেলিসার মেয়ে ক্যাসি এলিসন। ক্যাসির বয়স ছিল তখন মাত্র ১৩ মাস। তাঁর মা হত্যার শিকার হওয়ার পর থেকেই ঘটনাটি তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। প্রায় ২৫ বছর পর নিজের মেয়ের বয়স যখন তাঁর নিজের শৈশবের সেই বয়সে পৌঁছায়, তখন মায়ের মৃত্যুর যন্ত্রণা যেন নতুন করে তিনি অনুভব করেছিলেন।

সৈকত ভালোবাসতেন মেলিসা। ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম
সৈকত ভালোবাসতেন মেলিসা। ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম

বছরের পর বছর মেলিসার পরিবার পুলিশের কাছে নানা সূত্র নিয়ে ছুটেছে। তাঁর দুই বোন গ্লেন্ডা ব্ল্যান্ডফোর্ড ও সিসি বেনেটও সেই দীর্ঘ অপেক্ষার সাক্ষী। ২০১৯ সালে তাঁদের মা ক্যাথরিন টেলর মারা যান মেয়ের হত্যার রহস্য না জেনেই।

২০১৮ সালে বেনেটের এক বন্ধু মামলাটি ‘প্রজেক্ট: কোল্ড কেস’ নামে একটি সংগঠনের কাছে জমা দেন। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মেলিসার পরিবার ও সংগঠনটি ফার্স্ট কোস্ট ক্রাইম স্টপার্সের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন করে জনসাধারণের সহায়তা চায়।

সেখানে ক্যাসি বলেছিলেন, কেউ না কেউ জানেন সেদিন রাতে কী ঘটেছিল; এমনকি কেউ হয়তো প্রায় চার দশক ধরে সেই তথ্য নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছেন।

জ্যাকসনভিল শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, জানুয়ারির ওই সংবাদ সম্মেলনের পর পাওয়া কিছু তথ্য সাম্প্রতিক তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে গ্রেপ্তার হলেও মেলিসার পরিবারের কাছে এটি এখনো পুরোপুরি ‘ন্যায়বিচার’ নয়। মেলিসার বোন ব্ল্যান্ডফোর্ড ও বেনেট জানান, প্রতিদিনই তাঁরা তাঁদের বোনকে স্মরণ করেন। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে পরিবার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। মেলিসা ভালোবাসতেন সমুদ্রসৈকত; তাঁর স্মৃতিতে সৈকতের কাছাকাছি বসবাসও শুরু করেছেন পরিবারের একজন। মেলিসার প্রিয় গান ছিল প্রিন্সের ‘পার্পল রেইন’; সেই স্মৃতি ধরে রাখা হয়েছে একটি বেগুনি ‘Reign’ জিপের মাধ্যমেও।

মেলিসার স্মরণে পরিবারের একটি অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। এবার খুনি গ্রেপ্তারের পরও সেই আয়োজন হবে। তবে এখন পরিবারের প্রার্থনা একটাই—হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার যেন শেষ পর্যন্ত হয়।

ক্যাসির ভাষ্যমতে, তাঁর জীবনে মাকে হারানোর ‘আগের’ কোনো সময় ছিল না। মায়ের হত্যাকাণ্ডই ছিল তাঁর জীবনের শুরু থেকে সঙ্গে থাকা বাস্তবতা। তাই প্রায় চার দশক পর একজন সন্দেহভাজনের গ্রেপ্তার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও, পরিবারের কাছে দীর্ঘ শোক ও হারানোর ক্ষত এখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত