Ajker Patrika

মাগা-সমর্থকদের স্বপ্নের নারী হয়ে ওঠা জেসিকা ফস্টারের আড়ালে যে প্রতারণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৬, ২০: ১৩
মাগা-সমর্থকদের স্বপ্নের নারী হয়ে ওঠা জেসিকা ফস্টারের আড়ালে যে প্রতারণা
ট্রাম্প, পুতিন ও জেলেনস্কির সঙ্গে জেসিকা ফস্টারের ছবি। ছবি: সংগৃহীত

সেনাবাহিনীর স্বর্ণকেশী সুন্দরী জেসিকা ফস্টার। তাঁর বেশ কিছু ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যেখানে দেখা যায়, তিনি একটি এফ-২২ র‍্যাপ্টর যুদ্ধবিমানের সামনে পোজ দিয়েছেন, মরুভূমিতে ছদ্মবেশ ধরে হাঁটছেন এবং ইরানের ওপর হামলার প্রথম দিনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রানওয়েতে হাঁটছেন।

ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন—মাগার’ স্বপ্নের এই দেশপ্রেমিক তরুণীর জীবনচিত্র তুলে ধরা অসংখ্য ছবি ও ভিডিও তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টকে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তুলেছে। মাত্র চার মাস আগে পোস্ট করা শুরু করার পর থেকে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এক মিলিয়নেরও বেশি বেড়েছে।

কিন্তু ফস্টার আসলে এক ভ্রম! বিশেষজ্ঞদের মতে—তিনি সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ইমেজ জেনারেটর দিয়ে তৈরি এক ভুয়া নারী। সামরিক বাহিনীতে তাঁর রেকর্ড নেই, আর অ্যাকাউন্টটিতে এআই হিসেবে চিহ্নিত না থাকলেও অসংখ্য লক্ষণ রয়েছে যে তিনি বাস্তব নন। ট্রাম্পপন্থী বহু পোস্টের মাঝখানে ফস্টার নিজের ফর্সা পা-ও স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করেন।

ফস্টারের ভাইরাল উত্থান অনলাইনে মনোযোগ কাড়ার এক ক্রমবর্ধমান কৌশলকে সামনে এনেছে। ডানপন্থী অসংখ্য অ্যাকাউন্ট দেশপ্রেম ও সফটকোর পর্নোগ্রাফির মিশ্রণ ব্যবহার করে, ভুয়া নারী ও বিশ্বাসযোগ্য ছবি দিয়ে বিভ্রান্ত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করে, সেই আগ্রহকে অর্থে পরিণত করে এবং রাজনৈতিক ফায়দা তোলে।

ট্রাম্প-সমর্থক সৈনিক, ট্রাকচালক ও পুলিশ কর্মকর্তা সেজে থাকা এআই-নির্মিত নারীদের অ্যাকাউন্ট টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে দ্রুত দর্শক বাড়িয়েছে। হাজার হাজার মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, অনেকে সত্যিই মনে করেন এসব নারী বাস্তব। এই কৌশলের একটি সংস্করণ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও দেখা গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নারী সৈনিক ও পাইলটদের সামরিক বাহিনীকে উৎসাহ দিতে দেখা যাচ্ছে এমন শত শত এআই ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো ভুয়া হওয়ার একটি স্পষ্ট প্রমাণ হলো, ইরানে নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রের ভূমিকা নিষিদ্ধ।

ডিপফেক নিয়ে গবেষণা করা ভিডিও-অ্যাডভোকেসি সংস্থা উইটনেসের নির্বাহী পরিচালক স্যাম গ্রেগরি বলেন, ফস্টার দেখিয়ে দিয়েছেন যে এআই ভিডিও জেনারেটর কতটা প্রতারণামূলক হতে পারে।

এআই প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এখন নির্মাতারা বহু ছবি বা ভিডিওতে ব্যবহারযোগ্য একটি ধারাবাহিক ভুয়া চরিত্র তৈরি করতে পারেন এবং তাকে বাস্তব জননেতাদের পাশে বসিয়ে এমনভাবে দেখাতে পারেন যেন সে সত্যিকারের ঘটনাগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। গ্রেগরির মতে, এসব চরিত্রের ভুয়া জীবনে রাজনৈতিক আবহ ও চলমান ঘটনাকে যুক্ত করার মাধ্যমে নির্মাতারা ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে চান এবং ভিড়ভাট্টা অনলাইনে আলাদা করে নজরে পড়তে চান। একবার মনোযোগ পেয়ে গেলে তারা ব্যবহারকারীদের অর্থের বিনিময়ে আরও উত্তেজক কনটেন্ট দেখার জন্য পেইড প্ল্যাটফর্মে পাঠায়।

তিনি বলেন, ‘ফস্টার হলেন মাগা শিবিরের কল্পনার সর্বোচ্চ প্রদর্শন, সবকিছু এক চ্যানেলে গুঁজে দেওয়া। কিন্তু এটা স্পষ্টতই এআই। ছবির কোনো উৎস নেই, কোনো অতীত নেই, ত্রুটিও চোখে পড়ে। সুন্দর বাস্তব বা অবাস্তব নারী অনলাইনে অনেক আছে, কিন্তু ক্ষমতার এত কাছাকাছি এবং বড় ঘটনাগুলোর মাঝখানে থাকা এমন চরিত্রের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।’

ফস্টার অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারী অজ্ঞাত ব্যক্তি মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। ওয়াশিংটন পোস্ট মন্তব্য চাইলে বুধবার অ্যাকাউন্টে একটি নতুন ছবি পোস্ট করা হয়, যেখানে ফস্টারকে হরমুজ প্রণালিতে একটি সামরিক জাহাজে ভ্রমণ করতে দেখা যায়।

মার্কিন সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, ফস্টার নামে কোনো ব্যক্তির রেকর্ড পাওয়া যায়নি। মেটার একজন মুখপাত্র বলেন, নীতিমালা ভঙ্গের কারণে বৃহস্পতিবার রাতে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউস মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

থ্যাঙ্কসগিভিংয়ে পোস্ট করা ফস্টারের প্রথম ভিডিওতে নীলনয়না নারীটিকে আঁটসাঁট শার্ট পরে মার্কিন পতাকার নিচে বসে থাকতে দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘যে সব স্ট্রেইট (যৌন অনুভূতির ক্ষেত্রে নারীদের পছন্দ করা) ছেলে আমেরিকান আর্মির নারী সদস্যকে পছন্দ করো, তারা মন্তব্য করো।’

এরপর কয়েক মাসে ৫০টিরও বেশি ছবি ও ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে তাঁকে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমি পুতিন এবং ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির সঙ্গে দেখা করতে দেখা যায়। এসব মুহূর্তের ফাঁকে ফস্টার অশ্লীল রসিকতা করেন, বক্তৃতা দেন এবং নারী সহকর্মীদের সঙ্গে বালিশযুদ্ধে অংশ নেন। গত মাসে হেলমেট ও ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট পরে থাকা একটি ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘পৃথিবীর সেরা চাকরি।’

এসব দৃশ্য অস্বাভাবিক হলেও খুঁটিনাটিতেই ধরা পড়ে ভুয়া হওয়ার চিহ্ন। তাঁর ইউনিফর্মের ব্যাজে এমন সব যোগ্যতার মিশ্রণ দেখা যায়, যা বোঝায় তিনি একসঙ্গে স্টাফ সার্জেন্ট, রেঞ্জার স্কুল স্নাতক বা এক তারকা জেনারেল হতে পারেন। এক ছবিতে তাঁকে ‘বর্ডার অব পিস কনফারেন্সে’ বক্তৃতা দিতে দেখা যায়, যা ট্রাম্পের নতুন ‘বোর্ড অব পিসের’ বিকৃত রূপ। আরেক ছবিতে তিনি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি অবস্থায় ধরে আছেন বলে দেখানো হয়েছে। কিন্তু ইউনিফর্মে যেখানে পদবি থাকার কথা সেখানে তাঁর প্রথম নাম লেখা।

তবুও হাজার হাজার ব্যবহারকারী তাঁর কমেন্ট বক্সে ভিড় করেছেন। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান আন্দ্রেসেন হোরোভিৎসের বিনিয়োগকারী জাস্টিন মুর এক্স-এ লিখেছেন, ‘স্পষ্টতই এআই হওয়া সত্ত্বেও এত মানুষ এসব ইনফ্লুয়েন্সারকে অনুসরণ করছে দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত।’

ফস্টারের পোস্টগুলোতে মোট এক লাখেরও বেশি মন্তব্য এসেছে, যার অনেকগুলোই পুরুষদের প্রোফাইল ছবি থাকা অ্যাকাউন্ট থেকে। কেউ কেউ তাঁকে এআই বলে শনাক্ত করলেও অনেকেই শুধু তাঁর সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন, হার্ট-আই ইমোজি পাঠিয়েছেন বা উৎসাহ দিয়েছেন। ব্রাজিলের এক পরিবহন কর্মকর্তার যাচাইকৃত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট তাঁর অধিকাংশ ছবিতে লাইক দিয়ে তাঁকে ‘লিন্ডা’ বা সুন্দরী বলেছেন। আরেকজন লিখেছেন, ‘তুমি কখনোই উত্তর দাও না কেন?’

‘ট্রেনিং’, ‘ইউএস’ এবং ‘ডেইলি আর্মি’ নামের গ্যালারি থাকা ফস্টারের ইনস্টাগ্রাম আগে ওনলি ফ্যানসের এক অ্যাকাউন্টে লিংক দিত, যা পর্ন নির্মাতাদের জনপ্রিয় সাবস্ক্রিপশন প্ল্যাটফর্ম। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র জানান, নিয়ম ভঙ্গের কারণে অ্যাকাউন্টটি সরানো হয়েছে, কারণ তাদের নীতিমালায় সব নির্মাতাকে যাচাইকৃত মানব প্রাপ্তবয়স্ক হতে হয়।

এখন ফস্টার দর্শকদের একটি ছোট প্ল্যাটফর্ম ফ্যানভিউতে নিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে এআই মডেল অনুমোদিত এবং ‘জেনারেটেড বা এনহ্যান্সড’ হিসেবে চিহ্নিত থাকে। সেখানে ‘জেসিকানেক্সটডোর’ নামের অ্যাকাউন্টে অবস্থান হিসেবে উত্তর ক্যারোলিনার বিশাল সামরিক ঘাঁটি ফোর্ট ব্র্যাগ দেখানো হয়েছে, যা আর্মির স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের সদর দপ্তর। বায়োতে লেখা, ‘দিনে জনসেবক, রাতে দুষ্টুমি করা মানুষ🤍।’

ইন্টারনেটে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এআই অপরিহার্য নয়। বাস্তব নারীদের ছবিও চুরি করে রাজনৈতিক বার্তা ছড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৩ সালে এক ট্রাম্প-সমর্থক নারীর ছবি বিকৃত করে বামপন্থী ‘রেজ বেইট’ অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইনফ্লুয়েন্সারদের মাগা সমর্থক হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জোয়ান ডোনোভান—যিনি মিডিয়া ম্যানিপুলেশন নিয়ে গবেষণা করেন—বলেন এআই এই ধরনের অ্যাকাউন্ট দ্রুত বাড়াতে সাহায্য করেছে। কারণ, এগুলো তৈরি করা সহজ, অসীমভাবে পরিবর্তনযোগ্য এবং অর্থ উপার্জনের পরিষ্কার পথ দেয়। রাজনৈতিক আবহও নিশ্চিত করে যে এসব ছবি মানুষের নিউজ ফিডে পৌঁছে যায়।

ডোনোভানের মতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, এই প্রতারণামূলক কৌশল তথ্যযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। অজ্ঞাতপরিচয়ে পরিচালিত এসব অ্যাকাউন্ট ‘বট বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার হয়ে প্রচারণা, ভ্রান্ত তথ্য বা যুদ্ধকালীন বক্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘এর বিপদ হলো আমরা এক অবাস্তব সমাজের দিকে এগোচ্ছি। রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানোর এটি কার্যকর উপায়। জেসিকা ফস্টারের “ফিট পিক” বিক্রি করাই তার শেষ রূপ কি না, আমরা তা-ও জানি না।’

তথ্যসূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত