ইরানে এখনো দু-একটি কাজ বাকি, ১০ মিনিটেই তা করতে পারি: ট্রাম্প

ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেই গতকাল শনিবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফোনে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। কথোপকথন সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
একই দিন ফ্লোরিডার পাম বিচে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানে এখনো এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো বাকি রয়েছে। চাইলে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই সেগুলো ধ্বংস করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখনো একটি বা দুটি স্থাপনার কাজ শেষ করতে হবে। তবে আমরা ১০ মিনিটের মধ্যেই তা করতে পারি। আপনারা সম্ভবত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের কথা ভাবতে পারেন। সেটির বিষয়েও ব্যবস্থা নিতে হবে।’
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন একটি স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে পারমাণবিক উপাদান সংরক্ষণ করা হয়ে থাকতে পারে। চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ওই স্থাপনায় হামলা চালায়নি। ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে খুব একটা নির্ভরযোগ্য মনে করেন না তিনি।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের অবসানের পথ খুঁজতে শনিবার কাতারের রাজধানী দোহায় দেশটির মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন ইরানি আলোচকেরা। আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া ঠেকাতে কূটনীতিকেরা তৎপরতা চালাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্র জানায়, গতকাল শনিবার দোহায় আলোচনার আগে শুক্রবার তেহরানে ইরানি ও কাতারি প্রতিনিধিদের মধ্যে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আলোচনা হয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে এসব আলোচনা সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অঞ্চলটির দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও ইরানে হামলা শুরু করতে পারেন। ইরান বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশটির ওপর নতুন করে হামলা হলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানা হবে। শনিবার এর আগে তিনজন জ্যেষ্ঠ উপসাগরীয় আরব কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এমএস নাউ জানায়, ইরানে সম্ভাব্য নতুন দফার হামলার জন্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। আগামী ৪ নভেম্বর, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরদিন থেকেই এ হামলা শুরু হতে পারে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
ওই কর্মকর্তাদের মতে, সম্ভাব্য হামলা স্বল্পস্থায়ী হলেও তা হবে তীব্র। তবে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনকে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য চাপ দিচ্ছে। গত ১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কোনো হামলা চালায়নি। ট্রাম্পও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালাবেন না।
এদিকে শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে যেকোনো হামলার জবাব দিতে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পরে ইরানের সামরিক বাহিনী জানায়, যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়াতে তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ী জানিয়েছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর দেশটির দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তেহরানে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে একটি ফতোয়া বা ধর্মীয় নির্দেশনার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন নিষিদ্ধ করেছিলেন। এরপর থেকে ইরান ধারাবাহিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
শনিবার রেজায়ী বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের দাবিগুলো মেনে না নেওয়া পর্যন্ত দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ইরান নিজস্ব সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করে আসছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথমে ওয়াশিংটনকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সমর্থিত একটি নৌপথ অনুমোদন করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলে বিরোধপূর্ণ প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া হবে।
রেজায়ী আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে একটি চিঠি পাঠানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ও মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি চিঠিটি পড়েছি। তবে এখনো এর জবাব দিইনি। তাদের বক্তব্যের ধরন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের এই পরিবর্তনকে ‘ভালো লক্ষণ’ উল্লেখ করে রেজায়ী বলেন, এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে ইরান ‘নিজেদের বিজয় সুসংহত করেছে’। তবে চিঠিটির জবাব এখনো দেননি জানিয়ে এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
রেজায়ীর এসব মন্তব্যের সময় কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত ছিল। যদিও ইরানি কর্মকর্তারা শনিবার এর আগে জানিয়েছিলেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।








