Ajker Patrika

মার্কিন ও ভারতীয় ৮ প্রতিষ্ঠানে গ্রিন কার্ড সুবিধা বন্ধ করলেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মার্কিন ও ভারতীয় ৮ প্রতিষ্ঠানে গ্রিন কার্ড সুবিধা বন্ধ করলেন ট্রাম্প
প্রতীকী ছবি

দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের পথ বন্ধ করে প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট, সফটওয়্যার নির্মাতা অ্যাডোবি এবং ভারত ও বৈশ্বিক বাজারের শীর্ষ ছয়টি আইটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী আবাসন বা গ্রিন কার্ড আবেদনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সময়ে দেশটি নয়টি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত শুরু করেছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে যে জালিয়াতি বন্ধ ও মার্কিন নাগরিকদের চাকরি রক্ষা করতেই এ পদক্ষেপ সম্প্রসারিত করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন শ্রম বিভাগের ঘোষিত এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে বিদেশি কর্মী নির্ভর শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া থমকে গেল। নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া আইটি ও সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিস, উইপ্রো, কগনিজ্যান্ট, এইচসিএল টেকনোলজিস ও ক্যাপজেমিনি।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি বংশোদ্ভূতদের সংখ্যা কমানো এবং তাদের স্থায়ীভাবে বসবাস ও নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া সীমিত করার জন্য ব্যাপকভাবে তৎপর রয়েছেন। বৃহস্পতিবারের এই জোড়া পদক্ষেপকে দক্ষ কর্মীদের অভিবাসন রোখে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের চেয়ে বেশি এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করেনি।’ তিনি জানান, গত বছর কোম্পানিটি ৬ হাজার মার্কিন কর্মীকে ছাঁটাই করার পাশাপাশি ৬ হাজার ৩০০টি অস্থায়ী এইচ-১বি ভিসা এবং প্রায় ৩ হাজার গ্রিন কার্ডের সুবিধা গ্রহণ করেছে।

আমেরিকায় অবদানের জন্য প্রযুক্তি খাতের বিলিয়নিয়ারদের—যার মধ্যে মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাদেলাও ছিলেন—সম্মানিত করার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই মন্তব্য এল। সত্য নাদেলা একসময় এইচ-১বি ভিসাধারী ছিলেন। একইভাবে আরেক উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও এইচ–১বি ভিসাধারী ছিলেন। ট্রাম্পের হাতে সম্মানিত পাঁচ সিইওর মধ্যে তিনজনই অভিবাসী। পুরস্কার বা পদক পাওয়ার পর এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নাদেলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, তিনি প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ও আমেরিকার সমৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে কাজ করে যাবেন।

মার্কিন শ্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ছাড়পত্র বা ‘পার্ম’ (PERM) আবেদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মাইক্রোসফট। অধিকাংশ চাকরিভিত্তিক গ্রিন কার্ড পাওয়ার জন্য এই ‘পার্ম’ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়, যেখানে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ করতে হয় যে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে মার্কিন কর্মীদের বেতন বা চাকরিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

এক বিবৃতিতে মাইক্রোসফট জানিয়েছে, গত অর্থবছরে তারা যে এইচ-১বি আবেদনগুলো জমা দিয়েছিল, তার প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল বিদ্যমান কর্মীদের চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে বা মর্যাদা পরিবর্তনের জন্য, নতুন কর্মী নিয়োগের জন্য নয়। এর আগে জুলাই মাসে কোম্পানিটি ৪ হাজার ৮০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়, যা তাদের বিশ্বব্যাপী মোট জনবলের প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ।

মার্কিন শ্রম সচিব কিথ সোন্ডারলিং জানান, বরখাস্তের এই সিদ্ধান্ত কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), উইপ্রো, এইচসিএল টেকনোলজিস এবং ক্যাপজেমিনির ওপরও প্রযোজ্য হবে। সোন্ডারলিং বলেন, ‘আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তর্ভুক্ত কোনো নতুন আবেদন গ্রহণ করব না এবং তাদের জমে থাকা পার্ম আবেদনগুলোও প্রক্রিয়াকরণ করব না।’ তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে এই কোম্পানিগুলো প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য চেষ্টা চালিয়েছে এবং তারা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসা অনুমোদন ও ১ লাখের বেশি স্থায়ী কর্মসংস্থান ছাড়পত্র পেয়েছে।

মার্কিন অভিবাসন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে অনুমোদিত এইচ-১বি সুবিধাভোগীদের সবচেয়ে বড় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ছিল অ্যামাজন। এরপরই ছিল টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিস, অ্যাপল ও মাইক্রোসফট।

ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেন, বরখাস্তের এই সিদ্ধান্ত ‘যতদিন প্রয়োজন’ ততদিন স্থায়ী হবে এবং প্রশাসন চায় কোম্পানিগুলো যেন তাদের কর্মী নিয়োগের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু কোম্পানি অকার্যকর চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে এবং পরবর্তীতে আবেদনকারীর অভাব দেখিয়ে কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগের অজুহাত উপস্থাপন করে।

তবে মাইক্রোসফট তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, সমমানের কাজ করা অন্যান্য কর্মীদের মতোই তারা এইচ-১বি কর্মীদের সমান বেতন দিয়ে থাকে। অ্যাডোবি, কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, এইচসিএল টেকনোলজিস, উইপ্রো এবং ক্যাপজেমিনি এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ভারতের আইটি শিল্প সংস্থা ‘নাসকম’ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভারতীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এইচ-১বি ভিসার ওপর তাদের নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে এবং ‘পার্ম’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের খুব কম কর্মীই গ্রিন কার্ডের আবেদন করে থাকেন।

উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বরে শ্রম বিভাগ প্রজেক্ট ফায়ারওয়াল নামে একটি কার্যকর অভিযান চালু করে, যার অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসের এক ঘোষণায় বিদেশ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য নতুন এইচ-১বি আবেদনে এককালীন ১ লাখ ডলার ফি ধার্য করা হয়।

তদন্তের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

ভ্যান্স আরও জানান, আমেরিকানদের মজুরি কমানোর উদ্দেশ্যে এক্সচেঞ্জ-ভিজিটর ভিসার অপব্যবহার করা হয়েছে—এমন অভিযোগে হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডসহ নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে। নয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক দ্য ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিও (এমআইটি) রয়েছে। শ্রম বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল অ্যান্থনি ডি’এসপোসিটো জানান, ইতোমধ্যে তাদের কাছে আইনি সমন বা নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

ডি’এসপোসিটো বলেন, বিদেশি প্রভাব, অনুচিত আর্থিক সম্পর্ক বা ভিসার অপব্যবহার কেন্দ্রীয় সরকার থেকে অনুদানপ্রাপ্ত গবেষণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি না, তা তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের প্রেসিডেন্টদের প্রতিনিধিত্বকারী আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সারাহ স্প্রিটজার বলেন, ‘এটি পুরো মার্কিন অর্থনীতিতে একটি বিশাল অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।’ তিনি জানান, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যগতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে থাকে।

এই তদন্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে হার্ভার্ডের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব আরও গভীর হলো। গত বছর ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অভিযোগকৃত অপকর্ম এবং অভিবাসন আইন মেনে চলার বিষয়টি নিয়ে হার্ভার্ডকে সমন পাঠিয়েছিল। হার্ভার্ড সে সময় সমনটিকে ‘ভিত্তিহীন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, তবে আইনের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছিল।

রয়টার্স গত সপ্তাহে জানিয়েছে, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিসা নীতির কারণে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবেদন নাটকীয়ভাবে কমে গেছে এবং এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের একটি সাংবাদিকতা প্রোগ্রামে ভর্তি প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত