বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি, ৯০ দিনের রসদ সংরক্ষণ করছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো

বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে অন্তত ৯০ দিন বাইরের সহায়তা ছাড়াই সচল রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। সম্ভাব্য সংঘাতে দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিড অচল হয়ে পড়া, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, ‘ফোর্ট্রেস’ (FORTRESS) নামের বৃহত্তর সামরিক উদ্যোগের আওতায় এ নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য, সামরিক বাহিনী যেসব বেসামরিক অবকাঠামো ও পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল, সেগুলো ব্যাহত হলেও মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল ফক্স নিউজকে বলেন, জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিচালনায় প্রচলিত বেসামরিক ও পৌর অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা আমাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিচালনার জন্য প্রচলিত বেসামরিক পৌর অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করতে চাই না। আমরা তা কোনোভাবেই করতে পারি না। এটি এমন এক ঝুঁকি, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
একই সঙ্গে সংকটের সময় বেসামরিক কারখানাগুলোকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে রূপান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। অস্ত্র, জ্বালানি ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় উপকরণের সরবরাহ সচল রাখতে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। ফোর্ট্রেস উদ্যোগের নেতৃত্ব দেওয়া পার্নেল বলেন, ‘বিদ্যুৎ এখন যুদ্ধেরই একটি অংশ। বিদ্যুৎ না থাকলে যোগাযোগব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, রসদ পরিবহন, উৎপাদন লাইন এবং সামরিক বাহিনীর মৌলিক কমান্ড কাঠামোও হারিয়ে যায়।’
ফোর্ট্রেসের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত প্রতিটি বড় সামরিক স্থাপনাকে অন্তত ৯০ দিন স্বাধীনভাবে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এ জন্য বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি ও যোগাযোগব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে পেন্টাগনের প্রস্তুতিতে বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ এ উদ্যোগ। এর পেছনে রয়েছে এমন আশঙ্কা যে, বড় কোনো সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তাকারী অবকাঠামোকে ব্যাহত করতে পারে।
পার্নেল বলেন, ‘আমি উপলব্ধি করেছিলাম, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনার বড় একটি অংশ এমন এক পুরোনো ধারণার ওপর গড়ে উঠেছিল, যেখানে ধরে নেওয়া হতো, দুটি মহাসাগর আমাদের সুরক্ষা দেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোঝেন, সেই পৃথিবী আর নেই। নতুনভাবে চিন্তা করার পথও তিনি ইতিমধ্যে তৈরি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে গোল্ডেন ডোম, পশ্চিম গোলার্ধের প্রতি নতুন করে মনোযোগ দেওয়া, গ্রিনল্যান্ড এবং পানামা।’
বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা
পেন্টাগনের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ বেসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর সামরিক বাহিনীর নির্ভরশীলতা। যোগাযোগ, রসদ ব্যবস্থাপনা এবং অস্ত্র উৎপাদনসহ সামরিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। ফোর্ট্রেস উদ্যোগে বহনযোগ্য পারমাণবিক চুল্লি, বৃহৎ পরিসরের ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং মাইক্রোগ্রিড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে সামরিক স্থাপনাগুলোকে বেসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হবে। ফলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলেও স্থাপনাগুলো নিজস্ব ব্যবস্থায় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
পার্নেল বলেন, ‘মিশনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থাকে স্বাধীন, সুরক্ষিত এবং বিকল্প ব্যবস্থাসম্পন্ন হতে হবে।’
পেন্টাগন ইতিমধ্যে বড় সামরিক স্থাপনাগুলোর বেসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে নতুন ৯০ দিনের স্বনির্ভরতার মানদণ্ড শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য মৌলিক পরিষেবাও এর আওতায় থাকবে।
বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে পেন্টাগন। সামরিক বাহিনীর অস্ত্র, সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে আসে। পার্নেল বলেন, ‘পরবর্তী সংঘাত সম্ভবত একাধিক রণাঙ্গনে পরিচালিত হবে। বড় কোনো যুদ্ধের পেছনের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকান। এমনটা ঘটলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।’
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফোর্ট্রেসের আওতায় গোলাবারুদ, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং চিকিৎসাসামগ্রীর কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহপথ ব্যাহত হলে কিংবা যুদ্ধকালীন চাহিদা অনুযায়ী দেশীয় উৎপাদকরা সরবরাহ বাড়াতে ব্যর্থ হলে এসব মজুত সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। যুদ্ধের সময় কোনো উপকরণ কত দ্রুত ব্যবহৃত হচ্ছে এবং উৎপাদকদের নতুন করে সেই সরবরাহ পূরণ করতে কত সময় লাগছে, তার ভিত্তিতে মজুতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে।
এ ছাড়া সামরিক বাহিনীর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ও ব্যবস্থাগুলোর ক্ষেত্রে অন্তত দুটি যোগ্য সরবরাহ বা উৎপাদনপথ নিশ্চিত করার শর্ত রাখা হয়েছে। এর ফলে কোনো একটি কারখানা, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা শিল্প সক্ষমতা হারিয়ে গেলেও সামরিক কার্যক্রমে বিঘ্নের ঝুঁকি কমবে।
যুদ্ধকালীন উৎপাদনে যুক্ত হবে বেসামরিক কারখানা
ফোর্ট্রেস উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক উৎপাদন খাতকে সামরিক প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী করে তোলা। এ লক্ষ্যে ‘সিভিল রিজার্ভ ম্যানুফ্যাকচারিং নেটওয়ার্ক’ (Civil Reserve Manufacturing Network) ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে পেন্টাগন। আগে থেকেই বিদ্যমান এ উদ্যোগকে ফোর্ট্রেস কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় সংকটের সময় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে রূপান্তরিত হতে সক্ষম বাণিজ্যিক কারখানাগুলো চিহ্নিত করা হবে।
নতুন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রস্তুতি নেওয়ার পরিবর্তে আগেভাগেই উৎপাদনকারীদের সক্ষমতা যাচাই, কারিগরি মানদণ্ড নির্ধারণ, সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত, চুক্তির কাঠামো তৈরি এবং উৎপাদনব্যবস্থা রূপান্তরের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে। দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের মধ্যেও উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতে নিয়মিত শিল্প খাতের সক্ষমতা পরীক্ষা এবং উৎপাদনব্যবস্থা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রূপান্তরের মহড়াও আয়োজন করা হবে।
যোগাযোগ ও স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সুরক্ষা
বিদ্যুৎ ও উৎপাদনব্যবস্থার পাশাপাশি সামরিক যোগাযোগ, নেভিগেশন এবং স্যাটেলাইট সক্ষমতা শক্তিশালী করার উদ্যোগও রয়েছে ফোর্ট্রেসে। এসব ব্যবস্থাকে বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপ ও বিঘ্নের বিরুদ্ধে আরও সুরক্ষিত করাই এর লক্ষ্য। এ পরিকল্পনার আওতায় জিপিএস সংকেত জ্যাম করা হলে কিংবা মহাকাশভিত্তিক সম্পদ ও অবকাঠামো ব্যাহত হলে সামরিক বাহিনী কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে, সে প্রস্তুতিও নেওয়া হবে। সামগ্রিকভাবে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সময় বেসামরিক অবকাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহ নেটওয়ার্কের ওপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর নির্ভরতা কমানোই এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য।
পার্নেল বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে একাধিক রণাঙ্গনে সংঘাত চলার মাঝখানে বসে এসব সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন না আপনি। আমাদের একটি পরিকল্পনা থাকতেই হবে।’ তিনি ফোর্ট্রেসকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একধরনের ‘বিমা ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, বড় কোনো যুদ্ধের কারণে সামরিক বাহিনীর নির্ভরশীল অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেও যেন মার্কিন বাহিনী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।









