Ajker Patrika

পাকিস্তানের পাঞ্জাবে সন্ত্রাসীদের গোপন বিচার কীভাবে হবে—কেন এত বিতর্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
পাকিস্তানের পাঞ্জাবে সন্ত্রাসীদের গোপন বিচার কীভাবে হবে—কেন এত বিতর্ক
লাহোরে অবস্থিত পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের ভবন। ছবি: আল-জাজিরা

পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবের আইনসভা এমন একটি আইন পাস করেছে, যার আওতায় সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত মামলার বিচার প্রায় সম্পূর্ণ গোপনে করা যাবে। বিচারক, সরকারি কৌঁসুলি, পুলিশ কর্মকর্তা, সাক্ষী এমনকি আসামিপক্ষের আইনজীবীর পরিচয়ও গোপন রাখার সুযোগ থাকছে নতুন আইনে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আল-জাজিরা জানায়, ‘অ্যান্টি-টেররিজম (পাঞ্জাব অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ গত ৩১ আগস্ট পাঞ্জাব অ্যাসেম্বলিতে পাস হয়। বিরোধী দলের সদস্যরা বিলটির প্রতিবাদে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। পরে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই বিলটি পাস করা হয়।

কী থাকছে নতুন আইনে

আইন অনুযায়ী, সরকার একজন জ্যেষ্ঠ আমলাকে ‘ডেজিগনেটেড অথোরিটি’ হিসেবে নিয়োগ করতে পারবে। ওই কর্মকর্তা কোনো সন্ত্রাসবাদী মামলা বা এ ধরনের একাধিক মামলাকে ‘বিশেষ নিরাপত্তা মামলা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ সুরক্ষা প্রয়োজন বলে মনে হলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

তবে ওই কর্মকর্তার পরিচয় গোপন থাকবে এবং তা শুধু লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জানতে পারবেন। কোন পরিস্থিতিতে কোনো মামলাকে ‘বিশেষ নিরাপত্তা মামলা’ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে, সে বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট সীমারেখা নেই। একই সঙ্গে কোনো আসামির এই শ্রেণিভুক্তির সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও রাখা হয়নি।

এরপর প্রধান বিচারপতি একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবিরোধী আদালতের বিচারককে মামলাটি পরিচালনার জন্য মনোনীত করবেন। পাঁচজন সরকারি কৌঁসুলির একটি তালিকা থেকে ডেজিগনেটেড অথোরিটি একজনকে বেছে নেবেন।

মামলার সঙ্গে যুক্ত বিচারক, কৌঁসুলি, পুলিশ কর্মকর্তা, সাক্ষী ও আসামিপক্ষের আইনজীবীর পরিচয় কোনোভাবেই প্রকাশ করা যাবে না। আদালতের আদেশেও নামের পরিবর্তে পদবি ব্যবহার করা হবে। সাক্ষীদের পরিচয় প্রকাশ করা হবে কোড নম্বরের মাধ্যমে।

প্রয়োজনে কারাগার থেকেও ভিডিও লিংকের মাধ্যমে শুনানি করা যাবে। এমনকি অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে তাঁদের পরিচয় গোপন রাখার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। মামলার নথি সিলগালা করে প্রধান বিচারপতি ও ডেজিগনেটেড অথোরিটির যৌথ হেফাজতে রাখা হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আইনে এই ব্যবস্থার কোনো মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়নি। পাশাপাশি সরকার প্রয়োজন মনে করলে ‘অন্যান্য উপযুক্ত ব্যবস্থা’ গ্রহণ করতে পারবে—এমন একটি বিস্তৃত ক্ষমতাও রাখা হয়েছে।

সরকারের যুক্তি

সরকারের দাবি, সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিচারক, কৌঁসুলি, তদন্ত কর্মকর্তা ও সাক্ষীদের ওপরও হুমকি বাড়ছে। ফলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রচলিত আইন যথেষ্ট নয়।

বিলটির প্রস্তাবক আইনপ্রণেতা খালিদ মাহমুদ রাঞ্জা বলেছেন, বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির হাতে থাকায় নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তাঁর দাবি, আইনটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য নয়, বরং ‘দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের’ বিচারের জন্য।

তবে পাঞ্জাবে সাম্প্রতিক কোনো নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী হামলা বা মামলাকে এই আইন প্রণয়নের কারণ হিসেবে সরকার প্রকাশ্যে উল্লেখ করেনি। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের অধিকাংশ প্রাণহানিই ঘটে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে; দেশটির সন্ত্রাস-সংক্রান্ত মৃত্যুর ৯০ শতাংশেরও বেশি এই দুই প্রদেশে ঘটে।

সমালোচকদের আপত্তি

আইনজীবী, বিরোধী রাজনীতিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নতুন আইনটি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সাংবিধানিক আইনজীবী রিদা হোসাইন বলেন, পাকিস্তানে বিচারক, কৌঁসুলি ও সাক্ষীদের ওপর সন্ত্রাসীদের হুমকি বাস্তব। কিন্তু সে কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য বিচারের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। তাঁর মতে, বিচারক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় গোপন থাকলে আসামির পক্ষে বিচারকের পক্ষপাত বা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগও থাকবে না।

বিরোধী আইনপ্রণেতা আহমার রশিদ ভাট্টির অভিযোগ, এই আইন নির্বাহী বিভাগের হাতে বিচারিক ক্ষমতার মতো ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে। মানবাধিকার কমিশন অব পাকিস্তানও বলেছে, কোন পরিস্থিতিতে এই অসাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে, আইনটি তা যথেষ্ট স্পষ্ট করেনি। ফলে সাধারণ নাগরিক, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেও এর অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।

আরেক সাংবিধানিক আইনজীবী মিয়া দাউদ বলেন, প্রচলিত আইনেই সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং প্রয়োজন হলে রুদ্ধদ্বার শুনানির ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই নিয়ন্ত্রণ আদালতের বদলে নির্বাহী বিভাগের হাতে চলে যাচ্ছে।

আগেও হয়েছে এমন উদ্যোগ

পাকিস্তানে এ ধরনের গোপন বিচারব্যবস্থার উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। বেলুচিস্তান ২০২৫ সালে একই ধরনের একটি আইন পাস করেছিল, যেখানে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বেনামে কোনো মামলাকে বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ পান। তবে সেখানে এই আইনের প্রয়োগের কোনো প্রকাশ্য নজির এখনো জানা যায়নি।

অন্যদিকে, সন্ত্রাসবাদের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাইবার পাখতুনখাওয়া এ ধরনের আইন গ্রহণ করেনি। এ কারণেই পাঞ্জাবের নতুন আইন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাঞ্জাবে সন্ত্রাসের মাত্রা তুলনামূলক কম হওয়ার পরও কেন এমন কঠোর ও গোপন বিচারব্যবস্থার প্রয়োজন হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সামনে আইনি লড়াই

নতুন আইনটি আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিরোধীরা বলছেন, এটি পাকিস্তানের সংবিধানে নিশ্চয়তা দেওয়া ন্যায্য বিচারের অধিকারের পরিপন্থী। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়নের এখতিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের হওয়ায় প্রাদেশিক আইনসভা এমন আইন করার ক্ষমতা রাখে কি না, সেটিও আদালতে প্রশ্ন উঠতে পারে।

আইনে কোনো ‘সানসেট ক্লজ’ না থাকায় নির্দিষ্ট সময় পর এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিলও হবে না। ফলে শেষ পর্যন্ত পাঞ্জাবের এই ‘গোপন বিচার’ ব্যবস্থা টিকে থাকবে কি না, তার সিদ্ধান্ত আইনসভায় নয়, আদালতেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত