Ajker Patrika

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে ইসরায়েলি সেটলারদের তাণ্ডব

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২: ৪০
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে ইসরায়েলি সেটলারদের তাণ্ডব
পশ্চিম তীরের নাবলুসের একটি গ্রামে ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ফিলিস্তিনিরা। ছবি: মিডল ইস্ট আই

অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুসের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ফিলিস্তিনি গ্রাম সাররায় শত শত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী (সেটলার) হামলা চালিয়ে বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়, সম্পত্তি ভাঙচুর করে এবং বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালায়। গত শুক্রবার এই হামলা ও ভাঙচুর হয়। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের এই গ্রামে হামলার ফলে কয়েকটি পরিবার নিরাপত্তার খোঁজে এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন। বাসিন্দাদের ভাষ্য, অন্তত দুটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসরোধজনিত সমস্যায় ভুগেছেন বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গ্রামের বাসিন্দারাও হামলাকারীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেন এবং আরও ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে তাদের মুখোমুখি হন।

এর আগে নাবলুস এলাকায় তেল শহরে প্রাণঘাতী হামলার পর থেকে বসতি স্থাপনকারীরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন হামলা চালিয়ে আসছে। সাররা গ্রামে এই হামলাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। সাররার বাসিন্দা মোহাম্মদ তুরাবি জানান, সেটলাররা তার বাড়িতে পাথর ও পেট্রোলবোমা (মলোটভ ককটেল) নিক্ষেপ করলে তিনি ও তার পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েন।

তাঁর বাড়ির আঙিনা, একটি গাড়ি এবং ভবনের নিচতলা আগুনে পুড়ে যায়। তবে তিনি জানান, তার পরিবার অক্ষত অবস্থায় সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। তিনি বলেন, ‘সেটলাররা শত শত লোক এসেছিল এবং অত্যন্ত সহিংসভাবে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা পাথর ও মলোটভ ককটেল বা পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে। এতে বাড়ির আঙিনা ও গাড়িতে আগুন ধরে যায়।’ তুরাবির অভিযোগ, কাছেই অবস্থান করছিল ইসরায়েলি সেনারা। তারা পুরো ঘটনা দেখলেও সেটলারদের থামাতে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।

সাররা পৌরসভার সদস্য আহমদ সাররাবি বলেন, গ্রামটিতে বসতি স্থাপনকারীদের হামলাটি ছিল সুসংগঠিত এবং পূর্বপরিকল্পিত। তাঁর ভাষ্য, সম্প্রতি সেটলাররা ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে সহজে পৌঁছাতে এবং হামলা চালাতে মাটির রাস্তা নির্মাণ করছিল। তিনি বলেন, ‘হাভাত গিলাদ আউটপোস্ট থেকে সেটলাররা এসে গ্রামের শুরুর দিকে অবস্থিত বাড়িগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। তারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং বিপুল সংখ্যায় এসে কয়েকটি বাড়ি ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।’

সাররাবিআরও জানান, শেষ পর্যন্ত গ্রামের বাসিন্দারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এতে আরও ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো সম্ভব হয় এবং হামলাকারীরা গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা উম্মে ওয়াহিদ বলেন, সেটলারদের হামলার ভয়ে তিনি প্রতিরাতে নিজের সন্তানদের নিয়ে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে রাত কাটান। তিনি জানান, ইসরায়েলি বুলডোজার তার মেয়ের বাড়ির কাছে এসে জলপাই গাছ উপড়ে ফেলতে শুরু করে। এরপর আশপাশের উপত্যকা থেকে শত শত সেটলার ব্যাপক হামলা চালায়।

তিনি বলেন, ‘এত বিপুল সংখ্যায় তাদের হামলা করতে দেখে আমরা শিশুদের নিরাপদ রাখতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমরা বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তারা বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর গ্রামের অন্য বাড়িগুলোতেও হামলা চালিয়ে জানালার কাচ ভাঙচুর করে এবং গাড়িগুলোর ক্ষতি করে।’ তিনি আরও জানান, ঘন ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করায় তার এক নাতি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। হামলার ঘটনায় শিশুরা ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।

উসকানিমূলক প্রচারণা

এই সহিংসতার সময়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রপন্থী সেটলার গোষ্ঠীগুলোর উসকানিমূলক প্রচারণা অব্যাহত ছিল। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। ফিলিস্তিনিরা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, এই উসকানি আরও সহিংসতা উসকে দেবে এবং বেসামরিক মানুষ ও তাদের সম্পত্তির ওপর হামলার জন্য এক ধরনের প্রশ্রয় সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে তারা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষার দাবিও জানিয়েছে।

ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্সি, সরকার এবং কমিশন অ্যাগেইনস্ট দ্য ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্টস সাম্প্রতিক এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এগুলো এমন একটি নীতির অংশ, যার উদ্দেশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের নিজ ভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা। তারা দ্রুত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে এসব হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ‘সেটলারদের হামলার পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করা দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ বন্ধ করার দাবি জানায়।

সাররার মেয়র নাআমান আবদুল্লাহ বলেন, গ্রামের পশ্চিমাংশে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এলাকাটি অসলো চুক্তি অনুযায়ী ‘এরিয়া–সি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ, যা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন। তিনি বলেন, ‘আমরা যে বাস্তবতার মধ্যে বাস করছি, তা আমাদের আশপাশের গ্রামের অবস্থার মতোই। শুক্রবার সকালে টেল গ্রামে চার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর সেটলাররা অন্য গ্রামগুলোতে গিয়ে তাদের বাড়িঘরে হামলা চালায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর তারা আমাদের গ্রামে আসে, জমি বুলডোজার দিয়ে সমতল করে, গাছপালা উপড়ে ফেলে এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।’ আবদুল্লাহ বলেন, বারবারের সেটলার হামলা এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আরোপিত বিধিনিষেধ মানুষের জীবনকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। তার ভাষায়, সামরিক গেট দিয়ে প্রায়ই সড়কগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে বাসিন্দাদের নিজেদের বাড়িতে পৌঁছাতে কাঁচা ও দুর্গম পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত