Ajker Patrika

ট্রাম্পের আলটিমেটাম, মোজতবার সবুজসংকেত—যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ পাশ কাটিয়ে হলো যুদ্ধবিরতি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৮: ১৭
ট্রাম্পের আলটিমেটাম, মোজতবার সবুজসংকেত—যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ পাশ কাটিয়ে হলো যুদ্ধবিরতি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গত সোমবার এক কৌতূহলী ঘটনার কথা জানতে পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলটিমেটামের সময় যখন ঘনিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর প্রতিনিধিদের নির্দেশ দেন চুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো তিনি এমন নির্দেশনা দিলেন বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা।

ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যেই ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, পর্দার আড়ালে তখন চলছিল জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সূত্রের সদস্যরাও যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগমুহূর্ত পর্যন্ত জানতেন না আসলে ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী ও পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ট্রাম্পের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করার পাশাপাশি ইরানের অবকাঠামোতে ব্যাপক বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা জানতাম না ঠিক কী হতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি ছিল একদম বন্য।’

আঞ্চলিক মিত্ররা ইরানের নজিরবিহীন পাল্টা হামলার আশঙ্কায় ছিল। ইরানের ভেতরেও কিছু বেসামরিক মানুষ সম্ভাব্য হামলার হাত থেকে বাঁচতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছিলেন। ১১টি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির শান্ত হওয়ার নেপথ্য কাহিনি সাজানো হয়েছে।

গত সোমবার সকালে হোয়াইট হাউসে যখন ইস্টার সানডের উদ্‌যাপন চলছিল, তখন মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে ফোনে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি মধ্যস্থতাকারীদের জানান, ইরানের পক্ষ থেকে আসা ১০ দফার প্রস্তাবটি ছিল ‘বিপর্যয় ও মহাবিপদ’। এরপর শুরু হয় সংশোধনের এক বিশৃঙ্খল দিন। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে খসড়া চালাচালি করছিলেন। মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও চেষ্টা করছিলেন দুই পক্ষের দূরত্ব ঘুচিয়ে আনতে।

সোমবার রাত নাগাদ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির একটি নতুন প্রস্তাবে মার্কিন অনুমোদন পাওয়া যায়। এরপর বিষয়টি খামেনির সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে ছিল, যিনি সোমবার ও গতকাল মঙ্গলবার পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত গোপনীয় ও শ্রমসাধ্য। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে গুপ্তহত্যার হুমকি থাকায় খামেনি মূলত বার্তাবাহকদের মাধ্যমে চিরকুট পাঠিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন।

দুটি সূত্র জানিয়েছে, খামেনির পক্ষ থেকে চুক্তি করার অনুমতি দেওয়াটা ছিল একটি বড় ধরনের ‘ব্রেকথ্রু’ বা অগ্রগতি। আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলছে, আরাঘচি শুধু আলোচনার টেবিলেই নয়, বরং রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডারদেরও চুক্তিতে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চীনও ইরানকে এই সংঘাত থেকে সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছিল।

তবে দিনের শেষে সোমবার ও গতকালের সব বড় সিদ্ধান্ত খামেনির হাত দিয়েই এসেছে। ওই আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, খামেনির সবুজসংকেত ছাড়া এই চুক্তি সম্ভব হতো না। গতকাল সকাল নাগাদ অগ্রগতির লক্ষণ স্পষ্ট হলেও ট্রাম্প তাঁর সবচেয়ে ভয়ানক হুমকিটি দেন—‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মারা যাবে’।

কিছু মার্কিন সংবাদমাধ্যম খবর দেয় যে, ইরান আলোচনা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। তবে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো জানায়, বিষয়টি তেমন ছিল না, বরং পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স হাঙ্গেরি থেকে মূলত পাকিস্তানিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্প ও তাঁর দলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগে ছিলেন, যদিও ইসরায়েলিরা শঙ্কিত ছিল যে, তারা পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।

গতকাল দুপুর নাগাদ দুই পক্ষ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে একমত হয়। এর তিন ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স হ্যান্ডেলে চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ করেন এবং উভয় পক্ষকে তা গ্রহণের আহ্বান জানান। এর পরপরই ট্রাম্পের কট্টরপন্থী মিত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে ফোন ও মেসেজ দিয়ে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে চাপ দিতে থাকেন। এমনকি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরাও বিভ্রান্ত ছিলেন। ট্রাম্প পোস্ট করার এক-দুই ঘণ্টা আগেও অনেকে বিশ্বাস করতেন যে—তিনি যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করবেন।

অবশেষে পোস্ট করার কিছুক্ষণ আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি নেন। এরপর তিনি পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলে চুক্তিটি চূড়ান্ত করেন। ট্রাম্পের পোস্টের ১৫ মিনিট পর মার্কিন বাহিনীকে অভিযান বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আরাঘচি পরে জানান, ইরান যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে এবং তাঁদের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় সাপেক্ষে জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেবে।

ইরান আসলে কতটুকু জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে বা নেতানিয়াহু কত দিন এই যুদ্ধবিরতি মেনে চলবেন, তা এখনো দেখার বিষয়। এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, নেতানিয়াহুকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে—শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র চাপ দেবে যেন ইরান পারমাণবিক উপাদান ত্যাগ করে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি থেকে সরে আসে।

আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে হতে যাওয়া আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন সম্ভবত ভ্যান্স। এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হতে যাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে, যার ফলে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট আজ বুধবার সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সেখানে তাঁরা ট্রাম্পের ধ্বংসাত্মক হুমকির যাঁরা সমালোচনা করেছিলেন, তাঁদের একহাত নেবেন। তাঁদের যুক্তি হবে, ট্রাম্পের হুমকির কারণেই এই চুক্তি সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে ইরান ঠিক এর উল্টো যুক্তি দিচ্ছে, তবে তারা হয়তো ভাবছে, ট্রাম্পের হুমকি সত্যিই শেষ হয়েছে কি না।

তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি পায়নি বাংলার জয়যাত্রা, শারজা বন্দরে ফিরে যাচ্ছে

আপনার জিজ্ঞাসা: হজের সময় ঋতুস্রাব শুরু হলে নারীদের করণীয়

৪০ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের খরচ কত, ক্ষতিপূরণের আবেদনই পড়েছে ২৮২৩৭টি

ছেলেকে নিয়োগ দিতে সুন্দরগঞ্জে মাদ্রাসা সুপারের জালিয়াতি

ইসলামাবাদে সাজ সাজ রব: ত্রিমাত্রিক সুরক্ষা বলয়, দুই দিনের ছুটি ও ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত