Ajker Patrika

হরমুজে সাবমেরিন কেব্ল কাটার হুমকি ইরানের, ঝুঁকিতে বৈশ্বিক ব্যাংকিং

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হরমুজে সাবমেরিন কেব্ল কাটার হুমকি ইরানের, ঝুঁকিতে বৈশ্বিক ব্যাংকিং
ছবি: সংগৃহীত

বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল করতে হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবল কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বা আইআরজিসির মুখপাত্র জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি এসব যোগাযোগ কেবলকে ‘বৈধ নতুন লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

এসব কেবল কেটে দেওয়া হলে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে আর্থিক বাজার, ব্যাংক লেনদেন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটতে পারে। জেনারেল মোহেব্বি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে সাতটি বড় কেবল গেছে। ইন্টারনেট ও বাণিজ্যিক তথ্যের সব প্রবাহই এসব কেবলের মধ্য দিয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুধু তাদের জানাতে চাই যে নতুন লক্ষ্যবস্তু ও নতুন অস্ত্রের আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে।’

জেনারেল মোহেব্বির ভাষ্য, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এখন অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমে এলেও পরিস্থিতি এমন একটি বিরতির পর্যায়ে রয়েছে, যার পর সংঘাতের সম্ভাব্য ‘তৃতীয় ধাপ’ শুরু হতে পারে। সেই পর্যায়ে ইরান যুদ্ধের একটি ‘নতুন ভৌগোলিক ক্ষেত্র’, নতুন লক্ষ্যবস্তু এবং নতুন অস্ত্রের পরিচয় দেবে। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের ওপর আবারও হামলা শুরু করা হতে পারে।

আইআরজিসি বিশেষভাবে একটি কেবলের কথা উল্লেখ করেছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ মাইল বিস্তৃত। এই বর্ণনার সঙ্গে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ-১ (এএফই-১) নামের সমুদ্রতলের কেবলটির মিল রয়েছে। কেবলটি ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারে সংযুক্ত হয়েছে। এশিয়ায় ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার এই কেবলের সঙ্গে যুক্ত হলেও বাংলাদেশ নয়।

ইরানের এক কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ চলাকালে একাধিকবার এই কেবল কেটে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এবং নতুন শত্রু তৈরি করার ঝুঁকি এড়াতে তেহরান এখন পর্যন্ত কেবলটিতে হামলার নির্দেশ দেয়নি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প যদি সংঘাত আরও বাড়িয়ে দেন, তাহলে কেবল কেটে দেওয়ার বিষয়টি ‘একটি বিকল্প হিসেবে থেকে যাবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই হুমকি প্রযুক্তিগত দিক থেকে বাস্তবায়নযোগ্য। তবে এই হুমকির প্রকৃত তাৎপর্য অনেক ক্ষেত্রেই ভুলভাবে বোঝা হচ্ছে। লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধ ও কৌশলবিষয়ক অধ্যাপক, সেন্টার ফর গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির সহপরিচালক এবং সামুদ্রিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আলেসিও পাতালানো বলেন, সমুদ্রের নিচের কেবলগুলো সাধারণত সবচেয়ে সরাসরি পথ ধরে স্থাপন করা হয়। সম্ভব হলে এগুলো অগভীর পানির মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়, যাতে সহজে সেগুলোর কাছে পৌঁছানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত করা যায়।

তিনি বলেন, এই নকশার কারণে কেবলগুলো অনিবার্যভাবে সরু ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথের মধ্য দিয়ে চলে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পানির গভীরতা ১০০ মিটারেরও কম থাকে। একই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের জাহাজগুলোকেও চলাচল করতে হয়। ইরানের হুমকি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সম্পর্কে অধ্যাপক পাতালানো বলেন, ‘এটি শুধু সম্ভবই নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরেই এটি একটি সুস্পষ্ট সম্ভাবনা হিসেবে বিদ্যমান।’

তিনি আরও বলেন, এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উন্নত সরঞ্জামসজ্জিত ডুবুরিরা সমুদ্রতলের গভীরে নেমে যেতে পারেন। কেবলগুলোর সঠিক অবস্থান জানা থাকলে তাঁরা সেগুলো কেটে দিতে বা ধ্বংস করতে পারেন। সাম্প্রতিক সময়ে দূরনিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান ব্যবহারের ফলে এ ধরনের অভিযান আরও সহজ হয়েছে। তাঁর মতে, বিভিন্ন রাষ্ট্র ১৯৫০-এর দশক থেকেই কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের সক্ষমতা অর্জন করে আসছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, কোনো পক্ষের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যত বেশি হবে, তার পক্ষে কেবল মেরামতের কাজ কঠিন করে তোলা তত সহজ হবে। বিশেষ করে গভীর পানিতে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা সেখানে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে। ফলে কেবলগুলো দীর্ঘ সময় অচল থাকতে পারে।

অর্থাৎ, শুধু কেবল কেটে দেওয়াই নয়, ঠিক কোথায় এবং কতটা গভীরে হামলা চালানো হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে ক্ষয়ক্ষতি কত দিন স্থায়ী হবে। আর হরমুজ প্রণালির পানি অগভীর হওয়ায় সেখানে এ ধরনের হামলা চালানোর প্রাথমিক বাধা তুলনামূলকভাবে কম।

বিশ্বের সবচেয়ে কম দৃশ্যমান, অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রতলের এসব কেবল। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তলদেশে ১০ লাখ মাইলেরও বেশি দীর্ঘ কেবল বিস্তৃত রয়েছে। আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদানের ৯৯ শতাংশেরও বেশি এসব কেবলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অধ্যাপক পাতালানোর মতে, হরমুজ প্রণালির সাতটি কেবলই কেটে দেওয়া হলে ইন্টারনেট সংযোগ অনিয়মিত ও সীমিত হয়ে পড়বে। আর্থিক লেনদেনের গতি কমে যাবে এবং ইরানের অভ্যন্তরেও তথ্য আদান-প্রদানে বিঘ্ন ঘটবে।

দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন তথ্যপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অঞ্চলে রয়েছে বিশাল ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো এবং ক্লাউড কম্পিউটিং পরিষেবা। ফলে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) মতো বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।

ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে লেনদেন পরিচালনাকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও সমস্যায় পড়তে পারে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তথ্যের জট তৈরি হওয়া এবং বিকল্প পথে তথ্য পাঠানোর কারণে সাধারণ যোগাযোগব্যবস্থার গতিও কমে যেতে পারে।

এই কাজ করতে বাইরের কোনো দেশের সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে অধ্যাপক পাতালানো বলেন, ইরানের ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্রব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই চীন ও রাশিয়ার তৈরি বিভিন্ন উপাদান রয়েছে। এই তিন দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার পথও সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর মতে, ইরান বিদেশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার সহায়তা নিতে পারে, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে তিনি মনে করেন, রাশিয়া বা চীন তাদের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেবে, এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি অন্যদের হাতে তুলে দেওয়ার বিশেষ আগ্রহ থাকার কথা নয়। অধ্যাপক পাতালানো সতর্ক করে বলেন, ইরানের এই হুমকিকে এমনভাবে দেখা ঠিক হবে না যে হয় সবকিছু অক্ষত থাকবে, নয়তো পুরো ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘এটি অবশ্যই একটি গুরুতর বিপদ। কিন্তু বিষয়টিকে আমাদের একটু ভিন্নভাবে দেখতে হবে। এটি কোনো সুইচ নয়, যা একবার চাপ দিলেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত