Ajker Patrika

অর্থনৈতিক মন্দায় বিক্ষুব্ধ ইরান, জোরালো হচ্ছে সরকার পরিবর্তনের দাবি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভকারীরা। ছবি: ফার্সের সৌজন্যে
রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভকারীরা। ছবি: ফার্সের সৌজন্যে

ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি ও আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। টানা চতুর্থ দিনের বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভের গতি কিছুটা কমলেও আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) গ্রামীণ ও মফস্বল প্রদেশগুলোতে আন্দোলন আরও সহিংস রূপ নিয়েছে। এটি ২০২২ সালের মাহশা আমিনি হত্যাকাণ্ডের পর ইরানে সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা এপি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ইরনার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গত দুই দিনে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তিনটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বুধবার রাতে কুহদাশত শহরে দাঙ্গাকারীদের হামলায় ২১ বছর বয়সী আমির হোসাম খোদায়ারি ফার্দ নামের এক বাসিজ সদস্য (আধা সামরিক বাহিনী) নিহত হন। এ ঘটনায় আরও ১৩ পুলিশ ও বাসিজ সদস্য আহত হয়েছেন।

ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার ইরানের চারমাহাল ও বাখতিয়ারি প্রদেশের লোরদেগান শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত দুজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে লোরদেগানের রাস্তায় বিক্ষোভ এবং গুলির শব্দ শোনা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা আবদোররাহমান বোরুমান্দ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান নিশ্চিত করেছে, নিহত দুজনই বিক্ষোভকারী। সংস্থাটি একটি স্থিরচিত্রও প্রকাশ করেছে, যেখানে শটগান হাতে এক ইরানি পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়। তবে লোরদেগানের সহিংসতা নিয়ে ইরানের সরকারি গণমাধ্যমগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগই লুর জাতিগোষ্ঠী-অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, এই প্রাণহানি বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে লোরদেগান অঞ্চলে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল। সে সময় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ব্যবহৃত দূষিত সুচের কারণে মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে—এমন প্রতিবেদনের পর বিক্ষোভকারীরা সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর চালিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে চিহ্নিত করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। বর্তমানে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১ ডলার সমান এখন প্রায় ১৪ লাখ রিয়াল (১.৪ মিলিয়ন)। ২০১৮ সালে এই হার ছিল মাত্র ৫৫ হাজার।

ইরানে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার প্রায় ৫০ শতাংশ। গত বছরের শেষে (ডিসেম্বর ২০২৫) এটি ছিল ৪২.২ শতাংশ।

খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের আকাশ যুদ্ধের পর দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামো আরও ভেঙে পড়েছে।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সংস্কারবাদী সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার কথা বললেও বাস্তবে পরিস্থিতি থমথমে। কুহদাশত থেকে ২০ এবং ফাসা শহর থেকে একজন নারীসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার এই বিক্ষোভের পেছনে ‘বিদেশি মদদ’ ও ‘রাজতন্ত্রীদের’ হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করছে।

ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি-আজাদ সতর্ক করে বলেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বৈধ হলেও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো চেষ্টাকে কঠোরভাবে দমন করা হবে।

এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন করে ‘স্ন্যাপব্যাক’ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের চাপ এবং জ্বালানি সংকটের কারণে তেহরান বর্তমানে চতুর্মুখী চাপে রয়েছে। তবে এই আন্দোলন কেবল রুটি-রুজির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে এখন সরাসরি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিও শোনা যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত