Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএর স্থাপনায় ইরানের হামলায় রাশিয়ার সহায়তার ইঙ্গিত, খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১১: ৫৬
মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএর স্থাপনায় ইরানের হামলায় রাশিয়ার সহায়তার ইঙ্গিত, খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানি হামলার পর আরব আমিরাতের ফুজেইরাহ এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি: এএফপি

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) বিভিন্ন স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলা হয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে রাশিয়া তথ্য (টার্গেটিং ডেটা) অথবা উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চার ব্যক্তি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা এসব সূত্র জানিয়েছে, হামলায় রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। তবে হামলার কার্যকারিতা, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ এবং ইরানের প্রতি রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সহায়তাকে সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এর আগে জানিয়েছে এবং মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ইরানের হামলায় রাশিয়া লক্ষ্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছে। তবে সিআইএর স্থাপনাগুলোর ওপর হামলায় রাশিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায় যে আলাদা তদন্ত করছে, তা আগে প্রকাশ করা হয়নি।

রয়টার্স ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে অন্তত দুটি সিআইএ স্থাপনায় হামলা হয়। এর একটি ছিল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে অবস্থিত সিআইএ স্টেশন এবং অন্যটি ছিল পূর্ব ইরাকে অবস্থিত একটি পৃথক সিআইএ স্থাপনা। কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, আরও কয়েকটি সিআইএ স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে, তবে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি।

একটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ স্মারকে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক সিআইএ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে রাশিয়া সম্ভবত ভূমিকা রেখেছে। নথিটিতে প্রবেশাধিকার থাকা ওই অঞ্চলের এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানালেও স্মারকটির প্রণেতার পরিচয় প্রকাশ করেননি।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্পর্কে ব্রিফিং পেয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, বিশ্লেষকদের ধারণা সৌদি আরবে হামলায় ইরানের শাহেদ ড্রোনের রাশিয়া-উন্নত দুটি সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছিল। তাঁদের মতে, একটি ড্রোন দূতাবাস ভবনের বাইরের অংশের একটি দুর্বল স্থানে গর্ত সৃষ্টি করে এবং দ্বিতীয় ড্রোনটি সেই গর্ত দিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে বিস্ফোরিত হয়। এ হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে আসছে। তবে সিআইএর মতো স্পর্শকাতর স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করা ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে, তখন মস্কো ওয়াশিংটনের কার্যক্রম ব্যাহত করতে আরও বড় ভূমিকা নিতে প্রস্তুত।

এদিকে, গত সপ্তাহান্তে জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ওই হামলায় ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সেনা ব্যারাকে আঘাত হানে, যাতে দুই মার্কিন সেনা নিহত হন। এরপর থেকেই রাশিয়া ইরানকে লক্ষ্য নির্ধারণে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে কি না, সে বিষয়ে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে হোয়াইট হাউস প্রশ্নটি সিআইএর কাছে পাঠিয়ে দেয়। তবে সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। জাতিসংঘে ইরানের মিশন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সৌদি সরকারও মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা আরও জানান, রাশিয়া ইরানের শাহেদ ড্রোনগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করেছে। বিশ্লেষকদের সন্দেহ, রিয়াদের হামলায় এই উন্নত সংস্করণগুলোর একটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

আরেকটি সূত্র জানায়, রাশিয়া ইরানকে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের নির্ভুলতা বাড়াতে কমেতা-এম নামের একটি স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা ইরানে তৈরি ন্যাভিগেশন প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল এবং জ্যাম করা কঠিন। মার্চ মাসে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম জানায় যে, রাশিয়া ইরানকে কমেতা-এম সরবরাহ করেছে। তবে ক্রেমলিন সেই প্রতিবেদন অস্বীকার করে একে ‘ভুয়া সংবাদ’ বলে দাবি করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশে সিআইএর স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে থাকা সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় বা ‘স্টেশন’ ছাড়াও নিরাপদ ঘাঁটি (সেইফ হাউস), লজিস্টিকস হাব এবং নজরদারি ও অন্যান্য গোপন অভিযানের বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনার অবস্থান কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়। সূত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত সিআইএ স্থাপনার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা অবস্থান প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এক সূত্রের ভাষায়, আক্রান্ত স্থাপনার সংখ্যা ছিল ‘একাধিক, তবে এক ডজনের কম।’ আরেকটি সূত্র বলেছে, ‘বেশ কয়েকটি’ স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে।

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা এখন খতিয়ে দেখছেন, রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসে হামলার ক্ষেত্রে ইরান রাশিয়ার দেওয়া লক্ষ্য নির্ধারণের তথ্য ব্যবহার করেছিল কি না। তবে এ বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। কয়েকটি সূত্রের মতে, ইরান হয়তো পুরো মার্কিন দূতাবাসকেই লক্ষ্য করেছিল এবং ঘটনাক্রমে সিআইএ স্টেশনে আঘাত হানে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, রাশিয়া ছাড়া খুব কম দেশেরই এমন সংবেদনশীল লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সক্ষমতা ও আগ্রহ রয়েছে।

সিআইএর সাবেক স্টেশন প্রধান ও আন্ডারকভার অপারেশন কর্মকর্তা ড্যানিয়েল হফম্যান বলেছেন, দুই দেশের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারত্বের কারণে মস্কো তেহরানকে সিআইএর স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করলে তা বিস্ময়কর হবে না। হফম্যান বলেন, ‘তাদের উভয়েরই স্বঘোষিত প্রভাববলয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে আনা বা সম্পূর্ণ নির্মূল করার অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত