Ajker Patrika

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় বাদ পড়ল ৯০ লাখ মানুষ, টার্গেট কারা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় বাদ পড়ল ৯০ লাখ মানুষ, টার্গেট কারা
বাদ পড়া ৯০ লাখের মধ্যে ৬০ লাখের বেশি ভোটারের নাম ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ হিসেবে বাদ দেওয়া হয়েছে। ছবি: ইন্ডিয়া ফোরাম

ভারতের সেনাবাহিনীর টেকনিশিয়ান ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুহাম্মদ দাউদ আলী। কিছুদিন আগে জানতে পারলেন, যে দেশের জন্য কাজ করে গেছেন, সেই দেশের ভোটার তালিকায়ই নেই তাঁর নাম। পাসপোর্ট ও সার্ভিস রেকর্ডের মতো বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও শুধু তাঁরই নয়, তিন সন্তানের নামও মুছে ফেলা হয়েছে তালিকা থেকে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেবল তাঁর স্ত্রীর নাম তালিকায় রয়েছে।

৬৫ বছর বয়সী দাউদ আলী ও তাঁর সন্তানেরাসহ পশ্চিমবঙ্গের ৯০ লাখ ভোটারের নাম ২০২৬ সালের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার আওতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যার ফলে রাজ্যটির মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশই বাদ পড়ল। চলতি মাসের শেষ দিকেই এই রাজ্যে নতুন সরকার নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে।

বাদ পড়া এই ৯০ লাখের মধ্যে ৬০ লাখের বেশি ভোটারের নাম ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ হিসেবে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে দাউদ আলীর পরিবারের মতো বাকি ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত। তাঁদের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

এখন পর্যন্ত ভারতের ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য, যেখানে এই প্রক্রিয়ার পর অতিরিক্ত একটি ‘বিশেষ বিচারিক প্রক্রিয়া’ যুক্ত করা হয়েছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভুয়া বা দ্বৈত নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত ভোটারদের তালিকাভুক্ত করতেই এই সংশোধন প্রক্রিয়া। তবে গত বছর বিহার রাজ্যে প্রথমবার এই প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই এটি আইনি চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের মুখে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিষয়টি চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়েছে।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, এই সংশোধনীর লক্ষ্য হলো একটি ‘নির্ভুল ভোটার তালিকা’ তৈরি করা, যাতে কোনো যোগ্য ভোটার বাদ না পড়েন এবং কোনো অযোগ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হতে না পারেন।

তবে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে এই উত্তেজনা আরও বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপি নেতারা নির্বাচনী ভাষণে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই শুদ্ধি অভিযানের লক্ষ্য হলো তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত করা। তৃণমূলের দাবি, এই শব্দটি মূলত মুসলিমদের লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে দেখা গেছে, বাদ পড়া তালিকায় অনেক হিন্দু ভোটারও রয়েছেন।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার বড় অংশই অরক্ষিত এবং আংশিকভাবে নদীবেষ্টিত। এর একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে গেছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই রাজ্যে অভিবাসন ও ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য। দেশের মোট ১৭ কোটি ২০ লাখ মুসলিমের প্রায় ১৪ শতাংশই এই রাজ্যে বাস করেন।

সাত কোটির বেশি ভোটারের এই রাজ্যে ২০১১ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। সেখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ভারতের সংসদীয় আসনের সংখ্যার দিক থেকে চতুর্থ সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা পশ্চিমবঙ্গ এখনো বিজেপির অধরা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলটি ২৯৪ টির মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসন পেয়েছিল।

তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপিকে সুবিধা দিতেই এই ভোটার সংশোধনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে, বিশেষ করে মুসলিমদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বারবার আইনি চ্যালেঞ্জের পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই অমীমাংসিত বিতর্ক রেখেই এপ্রিলের নির্বাচন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। ফলে ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য এখনো ঝুলে আছে।

বিতর্কের মূলে রয়েছে মূলত এই ভোটাররাই। তালিকায় নাম ফিরে পেতে এই ভোটাররা ২০০২ সালের ভোটার তালিকা দেখিয়ে নথিপত্র জমা দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ২০০২ সালের তালিকাকেই সর্বশেষ ‘নির্ভুল’ তালিকা হিসেবে গণ্য করা হয়।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত একটি নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে তাঁদের নথিপত্রে ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ চিহ্নিত করেছে এবং তাঁদের ‘সন্দেহভাজন ভোটার’ হিসেবে গণ্য করেছে।

যার ফলে পুনরায় যাচাইয়ের পরও দাউদ আলীর মতো অনেককে তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সংগৃহীত আসনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এই ঝুলে থাকা ২৭ লাখ ভোটারের প্রায় ৬৫ শতাংশই মুসলিম।

সামগ্রিকভাবে বাদ পড়া ৯০ লাখ ভোটারের মধ্যে ৩১ লাখ ১০ হাজারই মুসলিম, যা প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, রাজ্যে মুসলিমদের যে জনসংখ্যা তার তুলনায় ভোটার বাদ পড়ার এই হার অনেক বেশি।

দাউদ আলী ও তাঁর সন্তানদের এখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হবে। কিন্তু ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ। এ অবস্তায় নির্বাচনের আগে ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা তাঁরা দেখছেন না।

দাউদ আলী বলেন, ‘আমি স্তব্ধ। আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও অপমানিত বোধ করছি। আমাদের বিরোধ নিষ্পত্তি না করে তারা কীভাবে নির্বাচন করতে পারে? কার কাছে বিচার চাইব, বুঝতে পারছি না।’

এত নাম বাদ পড়ায় ভোটার তালিকার ত্রুটি, বাদ পড়ার ঝুঁকি এবং ‘যোগ্য’ ভোটার নির্ধারণের মানদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

রাজনীতি বিশ্লেষক সিবাজি প্রতিম বসু বলেন, ভারতে এমন কোনো উদাহরণ নেই, যেখানে ভোটাধিকার স্থগিত রেখে নির্বাচন হয়েছে। ২৭ লাখ ভোটারকে বাদ দেওয়া একটি ‘অযৌক্তিক প্রস্তাব’। এটি গণতন্ত্রের জন্য লজ্জার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার দাবি করেছেন, জাতীয় স্বার্থেই এই সংশোধন প্রয়োজন ছিল। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী কেবল ভারতীয় নাগরিকেরাই প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করতে পারেন। তাই অ-নাগরিকদের বাদ দেওয়া জরুরি ছিল।’

২৭ লাখ ভোটারের বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে নির্বাচন হওয়ার বিষয়ে তিনি রাজ্য সরকারকে দায়ী করে বলেন, বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে গিয়ে রাজ্যই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত করেছে।

এই সংশোধনীর প্রভাব সব এলাকায় সমান নয়। কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ এলাকায় যথাক্রমে ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ ও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার বাদ পড়েছেন, যা রাজ্যে সর্বোচ্চ হারের মধ্যে অন্যতম।

পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ভোটার কমেছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। সেখানে বাদ পড়া ভোটারদের ৮০ শতাংশই হিন্দু, যাঁদের বেশিরভাগই উত্তর ভারতের হিন্দিভাষী সম্প্রদায়ভুক্ত।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর ও কোচবিহারে বড় আকারে ভোটার ছাঁটাই হয়েছে। কেবল উত্তর ২৪ পরগনা জেলা থেকেই ১২ লাখ ৬০ হাজার ভোটার বাদ পড়েছেন। তাঁদের অধিকাংশ সেই জেলার জনতাত্ত্বিক চিত্র অনুযায়ী হিন্দু।

ভারতের সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদে ৭ লাখ ৪৯ হাজার (১৩ শতাংশ) নাম বাদ পড়েছে।

সীমান্তবর্তী এই জেলাগুলোই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এখানেই ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছে।

মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো জেলায় মুসলিমরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়ায় মতুয়া সম্প্রদায়ের মতো দলিত হিন্দুরা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন। মধ্যপ্রদেশ রাজ্যেও ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র কারণে বিপুল সংখ্যক ভোটার চিহ্নিত হয়েছেন। তবে সেখানে ২০২৮ সালের আগে নির্বাচন না থাকায় ভোটাররা নিজেদের প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট সময় পাচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি প্রচারণায় এখন এই ভোটার তালিকার বিতর্কটি অন্য সব বিষয়কে ছাপিয়ে গেছে।

নির্বাচনি সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘২৭ লাখ ভোটারের সমস্যার সমাধান না করে ভোট কীভাবে শুরু হতে পারে?’

গত শুক্রবার আদালত জানান, তাঁরা ১৩ এপ্রিল এই মামলাটি শুনবেন। তবে এর মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কমই দেখা যাচ্ছে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের নৃবিজ্ঞানী মুকুলিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, পশ্চিমবঙ্গের এই বর্জনের ধরন দেখে মনে হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীকে ‘বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তু’ করা হয়েছে।

তাঁর মতে, ভোট দেওয়া কেবল একটি প্রক্রিয়াগত অধিকার নয়, এটি প্রান্তিক মানুষের কাছে একটি অস্তিত্বের লড়াই। তিনি সুন্দরবনের এক ভোটারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘আমরা যদি ভোট না দিই, তবে আমরা যে বেঁচে আছি, কেউ সেটা মনে রাখার প্রয়োজনও বোধ করবে না।’

মালদহ জেলার সীমান্তবর্তী হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকার ৩৫ বছর বয়সী হাসনারা খাতুন চরম ক্ষুব্ধ। তাঁর বাবা, দাদা ও পরদাদারা এই দেশেরই ভোটার ছিলেন।

এখন তাঁদের পরিবারের সাত সদস্যের মধ্যে পাঁচজনের ভোটাধিকার স্থগিত করা হয়েছে।

হাসনারা বলেন, ‘আমাদের কার্যত অ-নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কী আছে কে জানে? এই ব্যবস্থার ওপর আর আস্থা রাখা যায় না। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আমরা আমাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত