
দুই দশকেরও বেশি সময় পর তৃণমূল কংগ্রেসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভাঙন দেখা দিয়েছে। গতকাল সোমবার ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় দলের ২৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনই বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট—এনডিএকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়ে স্পিকার ওম বিড়লার কাছে চিঠি জমা দিয়েছেন। এর ফলে সংসদে তৃণমূলের সংসদীয় দলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, বারাসতের সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার এক বার্তায় নিশ্চিত করেছেন, ২০ জন লোকসভা সদস্য এনডিএকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে স্পিকারকে জানিয়েছেন।
তবে তৃণমূলের একটি অংশ এই পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের এক সংসদ সদস্য দাবি করেন, গত ২০ মে লোকসভায় তৃণমূলের প্রধান হুইপ পদ থেকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে সরিয়ে শ্রীরামপুরের সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, ‘কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধান হুইপ করার চিঠি গত মাসেই পাঠানো হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাকলির চিঠির কোনো মূল্য নেই। তথাকথিত বিদ্রোহীদের চিঠি কোথায়? তাদের কাছে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যসংখ্যা নেই।’
তৃণমূলের দমদমের সংসদ সদস্য সৌগত রায়ও পরিস্থিতি নিয়ে সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা সংসদ সদস্যরা দিল্লিতে একটি বৈঠক করেছেন। আমি জানি না কতজন বিদ্রোহ করেছেন। তাঁরা যদি কোনো চিঠি দিয়ে থাকেন, তাহলে আমরা কী করতে পারি? এ বিষয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই।’
সূত্রের দাবি, বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ ও মহুয়া মৈত্র। দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সাফল্যের অন্যতম কৌশলবিদ হিসেবে ভূপেন্দ্র যাদবকে বিবেচনা করা হয়।
লোকসভার এই বিদ্রোহের আগে গত সপ্তাহেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূলের প্রায় ৫৮ জন বিধায়ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থী, প্রথমবারের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচন করেন। তবে বিধানসভার বিদ্রোহী শিবির এবং লোকসভার বিদ্রোহী শিবিরের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বিরোধী দলনেতা হওয়ার পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দেন, তৃণমূলের বিধায়কেরা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ও শুভেন্দু অধিকারী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাবেন। অন্যদিকে দিল্লির বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা সরাসরি বিজেপির পক্ষ নিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চরিত্রের প্রতিফলন। দলটির জন্মলগ্ন থেকেই বিজেপিকে ঘিরে এমন দ্বিধা ও কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে।
১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তখনো দলটির নামের সঙ্গে ‘অল ইন্ডিয়া’ যুক্ত হয়নি। সে বছর পশ্চিমবঙ্গে সাতটি লোকসভা আসনে জয় পেয়ে তৃণমূল কংগ্রেস কংগ্রেসকে পেছনে ফেলে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে ওঠে। এক বছর পর ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর মমতা বিজেপির এনডিএ জোটে যোগ দেন এবং রেলমন্ত্রী হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে তিনি কংগ্রেস ও বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় জোটের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছেন এবং ভেঙেছেন।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত তিনটি পৃথক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে দুটি গোষ্ঠী নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে। লোকসভার বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের নেতা কাকলি ঘোষ দস্তিদার এখনো স্পষ্ট করেননি, তিনি এবং বিজেপির সঙ্গে হাত মেলানো তাঁর ১৯ সহকর্মী নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল হিসেবে দাবি করছেন কি না।
এদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। তাঁরা সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিজেপির বিরুদ্ধে কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের বৈঠকে অংশ নেন। অন্যদিকে, ‘আসল তৃণমূল’ দাবিদার তৃতীয় গোষ্ঠীটি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় অবস্থান করছে। তারা নিজেদের শুভেন্দু অধিকারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।
ভাঙনের আগে লোকসভায় তৃণমূলের সদস্যসংখ্যা ছিল ২৮। বসিরহাট আসনের সংসদ সদস্য হাজি নুরুল ইসলামের মৃত্যুতে ওই আসনটি বর্তমানে শূন্য রয়েছে। রাজ্যসভায় দলটির সদস্যসংখ্যা ছিল ১২। এই সংখ্যার জোরেই তৃণমূল সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতিতে কংগ্রেসের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল।
বর্তমান বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের দলে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও শতাব্দী রায়ের মতো নেতারা। একই সঙ্গে রয়েছেন বর্ধমান পূর্বের প্রথমবারের সংসদ সদস্য শর্মিলা সরকারের মতো নতুন মুখও। লোকসভার এই বিদ্রোহের কয়েক ঘণ্টা আগেই তৃণমূলের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সুখেন্দু শেখর রায় সাংসদ পদ এবং দল থেকে পদত্যাগ করেন।
দীর্ঘদিন ধরে দিল্লি ও কলকাতায় তৃণমূল নেতারা বিরোধী রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরতে সংসদীয় আসনসংখ্যার কথা উল্লেখ করতেন। কিন্তু সোমবারের ঘটনাপ্রবাহ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের সেই রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
এদিকে দিল্লিতে বিদ্রোহীরা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা চালানোর সময় কলকাতার সাবেক মেয়র ও মমতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফিরহাদ হাকিম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এতে আরও কয়েকজন তৃণমূল বিধায়ক বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিতে পারেন বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগের পর সুখেন্দু শেখর রায় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাকে একেবারে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছিল। সিপিএমকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়েই তৃণমূল গঠিত হয়েছিল। দলের কোনো আদর্শ ছিল না। সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর আর কোনো ভিত্তি অবশিষ্ট ছিল না। দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল।’ পদত্যাগের পর তিনি ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনেও যান। সেখানেই তৃণমূলের বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। একটি সূত্র জানায়, ‘তিনি পৌঁছানোর সময় সেখানে তৃণমূলের কয়েকজন লোকসভা সাংসদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ভূপেন্দ্রর সঙ্গে সময় কাটান, তারপর চলে যান।’
এদিকে কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কড়া ভাষায় বিদ্রোহীদের সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ‘এই সংসদ সদস্যরা ২০২৪ সালে তৃণমূলের প্রতীকে জিতেছিলেন। জনগণের রায় এনডিএর পক্ষে ছিল না। সব লোভী ও স্বার্থপর বিশ্বাসঘাতকেরা এখনই বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন। আগে সাংসদ পদ থেকে পদত্যাগ করুন, তারপর বিজেপির টিকিটে নির্বাচন করুন। দেখা যাবে আপনারা কত বড় বীর।’
এদিকে দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের অধিকার নিয়ে আইনি লড়াইও শুরু হয়েছে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত ব্যক্তি, বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছেন।
ফলে লোকসভা, রাজ্যসভা ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাজুড়ে তৃণমূল কংগ্রেস এখন এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। দলটির নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী রাজনীতিতে ভূমিকা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে দলীয় নাম ও প্রতীকের মালিকানা নিয়ে আগামী দিনে আরও তীব্র সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েল-ইরান সংঘাত আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করে ইসরায়েলকে হামলা থামাতে চাপ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর স্বার্থের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে বলে দাবি মার্কিন কর্মকর্তাদের।
১৪ মিনিট আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা এইচ–১বি ভিসার ১ লাখ ডলারের ফি অবৈধ ঘোষণা করেছেন এক ফেডারেল বিচারক। আদালতের মতে, এটি জরিমানা নয়, বরং কংগ্রেসের অনুমোদনহীন একটি কর। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
১ ঘণ্টা আগে
তথাকথিত ‘সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকদের’ বাংলাদেশে জোরপূর্বক ‘পুশ ইন’ বা ঠেলে পাঠানো নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যায়ের মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে ১৪ সদস্যের একটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রতিনিধি
২ ঘণ্টা আগে
ওমান সাগরে ইরানগামী পালাউয়ের পতাকাবাহী একটি খালি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেটি বিকল করে দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আজ সোমবার এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে...
৯ ঘণ্টা আগে