Ajker Patrika

নেতাদের বিজেপির আনুকূল্য গ্রহণের হিড়িক, ‘বিশ্বাসঘাতকায়’ মমতার দলে ভাঙন চলছেই

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ১০: ৫৮
নেতাদের বিজেপির আনুকূল্য গ্রহণের হিড়িক, ‘বিশ্বাসঘাতকায়’ মমতার দলে ভাঙন চলছেই
মমতার দলকে রীতিমতো ভেঙেচুরে দিচ্ছে অমিত শাহের বিজেপি। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠক করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। গতকাল শনিবার হওয়া এই বৈঠকের আগে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গেও আলোচনা করেন। শনিবার দুপুরে দিল্লির মতিলাল নেহরু মার্গে যাদবের বাসভবনে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায়।

এই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তৃণমূলে আরও বড় ধাক্কা আসে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মানস ভূঁইয়া দল থেকে পদত্যাগ করেন। ৭৪ বছর বয়সী এই নেতা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেন, চলমান সংকট নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট। তবে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু জানাননি।

এই ঘটনাগুলোকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে। আগামী সোমবার বিদ্রোহী ২০ জন তৃণমূল সাংসদ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকে তাঁরা পৃথক গোষ্ঠী গঠনের দাবি জানাবেন এবং মূল তৃণমূলের বাইরে আলাদা আসন বরাদ্দের আবেদন করবেন।

তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদ জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া গত শুক্রবার দাবি করেন, দলের বর্তমান ২৮ জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে ১৯ জন ইতিমধ্যে বিদ্রোহী শিবিরকে সমর্থন করছেন। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় দল বদল করলে এই সংখ্যা বেড়ে ২০ হবে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানিয়েছেন, তাঁদের গোষ্ঠী স্বীকৃতি পেলে সংসদে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থন করবে। ৭৭ বছর বয়সী সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ছয়বারের লোকসভা সদস্য। তিনি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা উত্তর আসনের সাংসদ এবং লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা।

এদিকে ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক নিয়ে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘মমতা দিদি এই মানুষদের পদ ও সম্মান দিয়েছেন, আর বিনিময়ে তাঁরা এটাই দিলেন। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল বদলের ইতিহাস আছে। আমরা আগেও বলেছিলাম তিনি ভালো নন। তাঁর রাজনীতি মমতা দিদিকে বিভ্রান্ত করার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সে কথা বলার জন্য আমাকে দল থেকে বরখাস্তও করা হয়েছিল। আজ প্রমাণ হচ্ছে আমি ভুল বলিনি।’

কুণাল ঘোষ আরও অভিযোগ করেন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ক্ষমতা ও পদের লোভের’ তৃণমূলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘তাপস রায় ও সাজল ঘোষের মতো নেতারা সুদীপদার ব্যক্তিগত অনিরাপত্তা এবং দলের ভেতরে ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে দল ছেড়েছেন। আমি তাঁদের পক্ষে কথা বলায় শাস্তি পেয়েছিলাম। এখন নেতৃত্ব বুঝুক তাঁরা কাকে সমর্থন করেছিলেন।’

কুণাল ঘোষ আরও দাবি করেন, সপ্তাহের শুরুতে যখন সিআইডি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন থাকা প্রাঙ্গণে অভিযান চালায়, তখন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কোথায় আছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বলি আমি ইতোমধ্যে দিদির বাড়িতে আছি।’ তিনি বলেন—তাঁর স্ত্রী নয়না, যিনি তৃণমূলের বিধায়ক, সেখানে আসবেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি অপেক্ষা করেছি, কিন্তু তিনি আসেননি। এখন দেখা যাচ্ছে সুদীপদা বিজেপির দরজায় পৌঁছে গেছেন।’

কালিঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে দলীয় বৈঠকের পর কুণাল প্রশ্ন তোলেন, যাঁর ওপর এত আস্থা ও সম্মান দেখানো হয়েছিল, তাঁর কাছ থেকে এমন আচরণ পাওয়া কি প্রাপ্য ছিল? এ সময় তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ‘সুদীপকে নিয়ে বিজেপির সুবিধা হলো তারা এক কিনলে এক ফ্রি অফার পাচ্ছে। একজন এমন নেতা, যিনি উইগ পরেন, সঙ্গে একটি মোবাইল বিউটি পার্লারও পাচ্ছে।’ যদিও তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি, তবে ইঙ্গিত ছিল সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী নয়নার দিকে।

কুণাল ঘোষ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি শুধু দলীয় নেতৃত্বকেই নয়, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁর হয়ে কাজ করা কর্মী ও বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মানুষদেরও পেছন থেকে আঘাত করেছেন।

অন্যদিকে তৃণমূলের প্রবীণ সংসদ সদস্য সৌগত রায় বলেন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত। তিনি বলেন, ‘তিন-চার দিন আগে সুদীপ আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন তিনি কোথাও যাচ্ছেন না। কিছু করলে আমার সঙ্গে আলোচনা করেই করবেন। পরে দেখলাম তিনি শতাব্দীকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অপারেশন লোটাসের দায়িত্বে থাকা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে গেছেন। আমি আর কী বলব? দলে থাকা বা না থাকা মানুষের নৈতিকতার ওপর নির্ভর করে।’

সৌগত রায় আরও বলেন, ‘তিনি আমাকে বলেছিলেন কিছু করলে আমরা একসঙ্গে করব। কিন্তু পরে তিনি যাদবের বাসভবনে গেলেন। এর ব্যাখ্যা যে যেমনভাবে করতে চায় করতে পারে।’

তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, যারা দল ছেড়েছেন বা ভিন্ন শিবিরে গেছেন, তাঁদের কার্যত দল থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এদিকে দল নতুন সাংগঠনিক দায়িত্বও ঘোষণা করেছে। যুব সভাপতি হিসেবে অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি সায়নী ঘোষের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। আলিফা আহমেদকে নারী সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার সভাপতি পদ থেকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে সেখানে কুণাল ঘোষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মুসারাফ হোসেনকে সংখ্যালঘু সেলের সভাপতি করা হয়েছে।

অন্যদিকে রাজ্য বিধানসভায় তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৪ জনের একটি অংশ দল থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং স্পিকার রথীন্দ্র বসুর স্বীকৃতিও পায়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা করা হয়েছে। তবে এই স্বীকৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছে। মামলার শুনানি এখনো চলছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত